হুমকিতে পরিবেশ: উন্নয়নের নামে রাজশাহীতে ১ বছরেই ২৩ হাজার গাছ নিধন
স্টাফ রিপোর্টার: একসময় পরিচ্ছন্ন ও সবুজে ঘেরা রাজশাহী শহরকে দেশের অন্যতম পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সড়ক সম্প্রসারণ ও নানা সরকারি প্রকল্পের প্রভাবে সেই সবুজ সৌন্দর্য দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র এক বছরে রাজশাহী জেলায় রেকর্ড ২৩ হাজার ৪১টি গাছ কাটা পড়েছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এ সময়ে দেশজুড়ে মোট বৃক্ষনিধনের প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে এই রাজশাহী অঞ্চলে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে রাজশাহী মহানগরীতে গাছপালার পরিমাণ কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত সবুজ হারিয়ে যাওয়ার কারণে নগরীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বার্তা দিচ্ছে। সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) ক্যাম্পাস নির্মাণের ক্ষেত্রেও এই বৃক্ষনিধনের চিত্র ফুটে উঠেছে।
২০২৩ সালের জুনে রামেবির জন্য অধিগ্রহণ করা ২০৫ বিঘা জমিতে জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ জরিপে ২৫ হাজার ৮৪২টি ফলদ ও বনজ গাছ তালিকাভুক্ত করা হয়। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য মাটি ভরাটের পর থেকেই নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রকাশ্যে ও গোপনে গাছ কাটা শুরু হয়। নথিপত্র অনুযায়ী তিন দফায় ২ হাজার ৬৪২টি গাছ নিলামে বিক্রির তথ্য থাকলেও, বর্তমানে সরেজমিনে দেখা গেছে মাত্র এক শতাধিক গাছের অস্তিত্ব। অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ২২ হাজার মূল্যবান গাছ উধাও হয়ে গেছে। যদিও রামেবি উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক দাবি করেছেন নিয়ম মেনেই কাজ করা হয়েছে, তবে স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ-গাছ না কেটে ভবন নির্মাণের বিকল্প প্রস্তাব গণপূর্ত বিভাগকে দেওয়া হলেও তা বিবেচনা করা হয়নি।
শুধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, নগরীর অন্যান্য বড় প্রকল্পেও একইভাবে উজাড় হচ্ছে গাছপালা। পদ্মা নদী থেকে পানি আনার জন্য রাজশাহী ওয়াসা ৪ হাজার ৬২ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে থাকা শত শত গাছ কেটে ফেলেছে। সওজ জমিতে পাইপলাইন বসাতে গিয়ে এই বৃক্ষনিধন চালানো হয়, যেখানে কমপক্ষে এক হাজার গাছ কাটার কথা বলছেন পরিবেশবিদরা। একইভাবে, সার্কিট হাউস কম্পাউন্ডে ভবন নির্মাণে ৫২টি গাছ এবং নগরীর রাজীব চত্বর থেকে ঘোষপাড়া মোড় পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণে ৩০টি পরিণত কাঠবাদাম গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন জানান, নগরীর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে আড়াই লাখ নতুন চারা রোপণের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে গাছ বাঁচিয়ে অবকাঠামো নির্মাণের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। তবে পরিবেশবাদীদের মতে, নতুন চারা রোপণের চেয়ে কয়েক দশকের পুরোনো বড় ও ছায়াদানকারী গাছ রক্ষা করা অনেক বেশি জরুরি।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











