ঢাকা | জুলাই ২৩, ২০২৬ - ২:১৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ সনাক্তে রাজশাহী আসছেন চীনা বিশেষজ্ঞদল

  • আপডেট: Tuesday, July 21, 2026 - 11:00 pm

স্টাফ রিপোর্টার: জন্মগত হৃদরোগ কেবল একটি শিশুর সুস্থ শৈশবকে কেড়ে নেয় না, বরং একটি গোটা পরিবারকে ফেলে দেয় অনিশ্চয়তা আর বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসচ্ছল পরিবারগুলোর জন্য হৃদরোগের ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালানো যেন এক অসাধ্য সাধন। অনেক সময় সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত না হওয়া এবং আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে নীরবেই ঝরে যায় বহু কচি প্রাণ।

তবে এবার সেই অনিশ্চয়তার মেঘ কাটিয়ে বরেন্দ্রভূমির প্রাণকেন্দ্র রাজশাহীতে শুরু হয়েছে এক নতুন আশার যাত্রা। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল রাজশাহীর উদ্যোগে আজ বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী এক বিশেষ বিনামূল্যে হৃদরোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা ক্যাম্প।

মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর বাকির মোড়ে রাজশাহী ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই বিশেষ কর্মসূচিতে দেশের পাশাপাশি যোগ দিবেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। ৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের হৃদরোগের জটিলতা নির্ণয়ে একসঙ্গে কাজ করবেন চীনের ৭ সদস্যের একটি আন্তর্জাতিক পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি টিম ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) পরিচালকসহ ৮জন খ্যাতিমান পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট।

প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলা এই ক্যাম্পে রোগীদের কেবল বিনামূল্যে শুধু পরামর্শই দেয়া হবে না, বরং রোগের ভয়াবহতা পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী উন্নত চিকিৎসার জন্য শুধু ঢাকায় নয়, প্রয়োজনে চীনে সম্পূর্ন বিনামূল্যে চিকিৎসার সুবিধাও করা হয়েছে। উদ্যোগটির প্রতি জনমানুষের কতটা তীব্র সাড়া রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে ইতোমধ্যেই নিবন্ধিত ২৮শ’ এর বেশি শিশুর দীর্ঘ তালিকা দেখে। শুধু তাই নয়, এই ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্পে আরও দেড়শো অস্বচ্ছল পরিবারের শিশুকেও চিকিৎসাসেবা দেয়া হবে।

১৯৮৪ সালে মরহুম ডা. আব্দুল খালেকের দান করা জমিতে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আজ এ অঞ্চলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে এটি ক্রমাগত সেবা সম্প্রসারণ করে আসছে। বর্তমানে এখানে করোনারি এনজিওগ্রাম, স্টেন্টিং, পেসমেকার স্থাপন, পিটিএমসি, ২৪/৭ জরুরি বিভাগ, আউটডোর সেবা, সিসিইউ, পিসিসিইউ এবং আইসিইউ-এর মতো অত্যাধুনিক সুবিধা বিদ্যমান।

শুধুমাত্র অবকাঠামোগত সেবা নয়, অসচ্ছল রোগীদের আর্থিক সহায়তায় হাসপাতালটির ভূমিকা দৃষ্টান্তমূলক। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর থেকে গত দেড় বছরেই ভর্তি হওয়া দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসায় ১ কোটি ৮৭ লাখ ৯৮ হাজার ৯০৮ টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বস্তি বাড়াতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাসপাতালটি সরকার থেকে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। এই বরাদ্দের সুফল সরাসরি পৌঁছে যাবে প্রান্তিক মানুষের দুয়ারে। প্রায় ৪১ লাখ টাকার ওষুধ দেওয়া হবে হাসপাতালে ভর্তি দরিদ্র রোগীদের। ৫০ জন অসচ্ছল রোগী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং ১০০ জন গরিব রোগী ৫০% ছাড়ে এনজিওগ্রামের সুযোগ পাবেন। নতুন ডায়াগনস্টিক রিএজেন্টের ব্যবহারে হৃদরোগ সংক্রান্ত ৬টি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ফি ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমবে।

সংবাদ সম্মেলনে ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুল মান্নান জানান, এই চিকিৎসা ক্যাম্পের মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুর হার্টের জন্মগত ত্রুটি সময়মত সনাক্ত করে রোগের তীব্রতা নির্ণয় করে তাৎক্ষণিক কার্যকর চিকিৎসা সেবা দেয়া। তিনি বলেন, হৃদরোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় প্রান্তিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানো জরুরি। সরকারি এই সাহায্য ভবিষ্যতে ১০ কোটি টাকায় উন্নীত করা সম্ভব হলে উত্তরবঙ্গের বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। তিনি বলেন, হৃদরোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সরকারি সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে উত্তরবঙ্গের আরও অসংখ্য অসহায় ও প্রান্তিক মানুষ আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবেন এবং উন্নত চিকিৎসা পাবেন। আগামী দুই বছরের মধ্যে ভবনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন করে শয্যা বাড়িয়ে হাসপাতালটিতে বাইপাস সার্জারি চালু সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মিজানুর রহমান খোকন বলেন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত শিশুদের সময় বেধে দেয়া হয়েছে। ওই স্কুলের শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের সময়মত চিকিৎসা ক্যাম্পে নিয়ে আসবেন। তাদের যাতায়াত খবর বহন করবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমরা এই ফ্রি চিকিৎসাসেবা ক্যাম্প সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সবধরনের উদ্যোগ নিয়েছি। এই চিকিৎসা ক্যাম্পের সমাপনীতে রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু উপস্থিত থাকার সদয় সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে সহসভাপতি হাসেন আলী, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক মো. লিয়াকত আলী, পরিচালক ও চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. রইস উদ্দিন মণ্ডল, পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) অধ্যাপক হবিবুর রহমান, নির্বাহী সদস্য ডা. ওয়াসিম হোসেন, এনামুল হক এবং প্রচার ও জনসংযোগ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ শামসুল হুদাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

রাজশাহীর এই বিশেষ ক্যাম্পটি শুধুমাত্র একটি চিকিৎসা আয়োজন নয়; এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের হাজারো পরিবারের কাছে নতুন করে বেঁচে থাকার তাগিদ। সঠিক শনাক্তকরণ আর সময়োপযোগী চিকিৎসার মাধ্যমে একটি শিশুর ছোট্ট হৃদস্পন্দন যদি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে, তবে সেটাই হবে এই মানবিক উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য।