সবুজের রাজশাহী গিলছে ‘অবৈধ’ বহুতল ভবন
স্টাফ রিপোর্টার: গত দুই দশকে বদলে গেছে বিভাগীয় শহর রাজশাহীর চেনা রূপ। তবে এই দৃশ্যমান নগরায়ণের আগ্রাসী থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে একসময়ের ‘গ্রিন সিটি’র চেনা সবুজ। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে অসংখ্য বহুতল ভবন।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ছাড়পত্র ছাড়াই নির্মিত এসব আকাশচুম্বী ইমারত এখন পুরো নগরীর জন্য এক একটি ‘টাইম বোম’ বা চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জানা যায়, দুই দশক আগে জীবন বীমা কর্পোরেশনের ভবনটিই ছিল রাজশাহীর একমাত্র ১০ তলা স্থাপনা। বর্তমানে নগরী বহুতল ভবনে ছেয়ে গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইমারত নির্মাণ বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সাত তলার উপরের স্থাপনাগুলোকে বহুতল ভবন হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু নগরীর উপশহর নিউমার্কেট মোড়ে ফায়ার সার্ভিসের কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই ৯ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন এক ব্যক্তি।
ডেভলপার কোম্পানির মাধ্যমে নির্মিত এই ভবনের ফ্ল্যাটগুলো ইতিমধ্যে বিক্রি করা হলেও পরে আরডিএ জানায়, সম্পূর্ণ অনুমোদনহীনভাবে এটি তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে মামলাও দায়ের করেছে কর্তৃপক্ষ। একই রকম ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে সাহেব বাজারের ১২ তলা একটি টাওয়ারের ক্ষেত্রেও।
অভিযোগ রয়েছে, বেশিরভাগ ভবন মালিক সাত তলার অনুমোদন নিয়ে অবৈধভাবে আট বা দশ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করছেন। ইমারত বিধিমালা অনুযায়ী ভবনের পাশে পর্যাপ্ত রাস্তা ছাড়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
আরডিএ-র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় বহুতল ভবনের সংখ্যা মোট ১ হাজার ২৪৫টি। এর মধ্যে ৮৪৮টি ভবনই ন্যূনতম রাস্তা না ছেড়ে গায়ের জোরে নির্মাণ করা হয়েছে। অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণের দায়ে বর্তমানে ১৪টি মামলা চলমান রয়েছে। এছাড়া, গত এক দশকে রাজশাহীতে সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি ভবন মালিককে নকশা বহির্ভূত বা অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে নোটিশ পাঠিয়েছে আরডিএ।
অন্যদিকে, রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক এক উদ্বেগজনক তথ্যে জানান, আবাসিক বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেট মিলিয়ে নগরীর ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নিয়ম না মেনে ভবন তোলায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তিনি।
বাড়ছে ক্ষোভ, উদ্ধার কাজ নিয়ে শঙ্কা: নগরবাসীর অভিযোগ, আরডিএ-র কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এবং আর্থিক সুবিধা নিয়ে অনেকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে নকশা অনুমোদন করিয়ে নিচ্ছেন। নুরুল ইসলাম নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে এসব ভবনের আশেপাশে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার মতো ন্যূনতম পথ নেই। উদ্ধার কাজ পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়ায় যেকোনো দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ দিয়ে বলেন, আরডিএ-র উচিত শুধু নোটিশ বা মামলা দিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা। নকশা বহির্ভূত অংশ ভেঙে গুঁড়িয়ে না দিলে এই অবৈধ দৌরাত্ম্য থামানো যাবে না।
অবশ্য আরডিএ-র ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল তারিক সাংবাদিকদের জানান, গত পাঁচ বছরে দেড় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৪০টি ভবনের বর্ধিত অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে আরডিএ-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, অনুমোদনহীন ভবন মালিকদের নোটিশ দিয়ে মামলা করার আইনি প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগছে। তবে নিয়ম বহির্ভূত সব বর্ধিত অংশ ভেঙে ফেলা হবে। এখন আরডিএ-র কোনো কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে প্ল্যান পাস করানোর কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে, সবুজ প্রকৃতিকে ধ্বংস করে গড়ে ওঠা এই অবৈধ বহুতল ভবনগুলো এখন রাজশাহীর পরিকল্পিত ও নিরাপদ নগরায়ণের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











