ঢাকা | জুন ১৭, ২০২৬ - ২:৫২ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

রাজশাহীর আম আন্তর্জাতিক বাজারে নিতে কোল্ড চেইন গড়ার পরামর্শ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের

  • আপডেট: Tuesday, June 16, 2026 - 11:05 pm

ঘুরে দেখলেন পুঠিয়া রাজবাড়ী ও নগর ভবন:

স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন গতকাল মঙ্গলবার এক ব্যস্ততম দিনে রাজশাহীর আম চাষ, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতি ও নগর উন্নয়ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। সফরের অংশ হিসেবে তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ বানেশ্বর আমের হাট, পুঠিয়া রাজবাড়ী, নগর ভবন ও স্থানীয় কালাই রুটির দোকান পরিদর্শন করেন। আম পরিদর্শনের সময় তিনি আমেরিকানদের আমপ্রীতির কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের আম রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়াতে উন্নত কোল্ড চেইন বা হিমাগার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

মঙ্গলবার সকাল ৯টায় রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান আমের হাট পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন আড়ত ও দোকান ঘুরে আম ব্যবসায়ী ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কয়েক জাতের আমের স্বাদ নেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রদূত বলেন, রাষ্ট্রদূত হিসেবে রাজশাহীতে এটি আমার প্রথম সফর। এর আগে ২০২০ সালে একবার এসেছিলাম। তবে এবার বিশেষভাবে আমের মৌসুমে এসেছি, কারণ আমি রাজশাহীর আমের স্বাদ নিতে চেয়েছিলাম। এখানে আসতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্য থেকে আসার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পণ্য উৎপাদনের স্থানে গিয়ে স্বাদ নেয়ার অভিজ্ঞতা অনন্য। বাংলাদেশের আম রপ্তানি প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, আমেরিকানরা আম খুব পছন্দ করলেও সেখানে সাধারণত হিমায়িত আম বেশি পাওয়া যায়, যা দিয়ে শেক তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রাজশাহীর মতো এত তাজা আম পাওয়া কঠিন। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশে কোল্ড চেইন বা হিমাগার ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সারা বছর আম সহজলভ্য রাখতে এবং হিমায়িত আম রপ্তানি বাড়াতে উন্নত কোল্ড চেইন ব্যবস্থা দরকার। এতে বাংলাদেশের আম উৎপাদন, সংরক্ষণ ও রপ্তানির সুযোগ আরও বাড়বে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা আশা প্রকাশ করেন, বিদেশি কূটনীতিকদের এমন আগ্রহ ও সফর রাজশাহীর আমকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করার পাশাপাশি কৃষিপণ্য রপ্তানির পথ সুগম করবে।

এদিকে আমের হাট পরিদর্শন শেষে দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন এশিয়া মহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান পুঠিয়া রাজবাড়ী জাদুঘর পরিদর্শনে যান। পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রদূতের চোখে-মুখে ব্যাপক উচ্ছলতা দেখা যায়। তিনি রাজবাড়ীতে নির্মিত জাদুঘর, রানীরঘাট, গোবিন্দ মন্দির, আন্নিক মন্দির, শিবমন্দিরসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখেন। রাজবাড়ীর গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির আরও অনেক উন্নয়ন দরকার এবং ভবিষ্যতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে এই রাজবাড়ীটির উন্নয়নে সহযোগিতা করা হবে। পরিদর্শনকালে তাঁর সঙ্গে ছিলেন রাজশাহী জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান, পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) লিয়াকত সালমান, থানার ওসি ফরিদুল ইসলাম, হাইওয়ে ওসি মোজাম্মেল হক ও রাজবাড়ী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অন্যদিকে ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার পর বিকেলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী খাদ্য সংস্কৃতির স্বাদ নিতে নগরীর উপশহর নিউ মার্কেট এলাকার ‘রুমন কালাই হাউজ’ পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কালাই রুটি প্রস্তুতের প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন এবং নিজের মোবাইল ফোনে ছবি ও সেলফি তোলেন। এছাড়া বেগুন ভর্তা তৈরি ও রাজহাঁসের মাংস রান্নাসহ বিভিন্ন খাবার প্রস্তুতের প্রক্রিয়াও দেখেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে কালাই রুটি ও রাজহাঁসের মাংস খেতে বসেন এবং খাবার শেষে অনুভূতি ব্যক্ত করে ভূয়সী প্রশংসাসহ বলেন, ‘দারুণ মজা!’ কালাইয়ের রুটি, হাঁসের মাংস ও বেগুন ভর্তার স্বাদ এককথায় দারুণ ছিল বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান। রাষ্ট্রদূতের আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় উৎসুক জনতার ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

এছাড়াও মঙ্গলবার বিকেলেই রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের সঙ্গে নগর ভবনে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় মিলিত হন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে রাজশাহী মহানগরীকে সবুজ, পরিবেশবান্ধব, স্মার্ট, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করা হয়। সাক্ষাতের শুরুতে রাষ্ট্রদূতকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান রাসিক প্রশাসক এবং বৈঠক শেষে তাঁর হাতে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেয়া হয়। এ সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত রাসিকের পরিদর্শন বইয়ে নিজের মন্তব্য ও স্বাক্ষর লিখেন।

সফরের প্রতিটি কর্মসূচিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাথে দূতাবাসের পলিটিক্যাল কাউন্সেলর এরিক গিলান, পলিটিক্যাল অফিসার চার্লস বেসনার্ডসহ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও নগর ভবনের বৈঠকে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম, সচিব সোহেল রানা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আহমদ আল মঈন পরাগ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকেরসহ অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পুরো সফরজুড়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস