ঢাকা | জুন ১৫, ২০২৬ - ১১:৫৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম

কেউ হাঁটতে পারে, কেউ পারে না: দুর্গাপুরে আলো ছড়াচ্ছে বিনা পয়সার ব্যতিক্রমী স্কুল

  • আপডেট: Monday, June 15, 2026 - 10:34 pm

মিজান মাহী, দুর্গাপুর থেকে: স্কুলটির বারান্দায় পা রাখলেই চেনা পৃথিবীর চেনা নিয়মগুলো বদলে যায়। এখানে কেউ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে, কেউ পারে না। কারও হাত-পা বাঁকা, কেউ ইশারায় খোঁজে পৃথিবীর ভাষা, আবার কেউ অবাধ্য কানে শুনতে পায় না বাইরের কোনো শব্দ।

সমাজের চোখে যারা ‘অবহেলিত’ কিংবা ‘বোঝা’, সেই বুদ্ধি, শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী শিশুদের বুকেই পরম মমতায় আলো জ্বালানোর এক অনন্য যুদ্ধ চলছে রাজশাহীর দুর্গাপুরে। আর দশটি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক বিদ্যাপীঠ দুর্গাপুর বুদ্ধি শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী স্কুল’।

উপজেলা সদর থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে গড়ে ওঠা এই আলো ছড়ানোর কারিগর স্কুলটিতে পড়াশোনা চলে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়। সুযোগ ও ভালোবাসা পেলে এই বিশেষ শিশুরা যে সমাজের বোঝা নয়, বরং সম্পদে পরিণত হতে পারে সেই স্বপ্ন বুকেই ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করে দুর্গাপুরের একমাত্র এই বিশেষায়িত স্কুলটি। স্থানীয় কয়েকজন গুণী মানুষের উদ্যোগে এবং আক্কাস আলী ও আফরোজা দম্পতি নিরলস প্রচেষ্টায় স্কুলটি আজ এই পর্যায়ে এসেছে।

সোমবার সকালে এই বিশেষ শিশুদের মাঝে এক টুকরো আনন্দ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাশতুরা আমিনা। শিশুদের জন্য তিনি নিয়ে এসেছিলেন শুকনো খাবার, নতুন বই ও নানা শিক্ষা উপকরণ। ইউএনও-কে কাছে পেয়ে আনন্দে মেতে ওঠে অবোধ শিশুরা, মেতে ওঠে উল্লাসে। কিছুটা সময় তিনি কাটান এই নিষ্পাপ শিশুদের সঙ্গে, নিজ হাতে তুলে দেন উপহার সামগ্রী।

সরজমিনে স্কুলটিতে গিয়ে দেখা যায়, নিজেদের অর্থায়নে গড়ে তোলা নিজস্ব ভবনে চলছে এর কার্যক্রম। প্রথম থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত এই স্কুলে বর্তমানে ১৩৫ জন বিশেষ শিশু পড়াশোনা করছে। এখানে ইশারার ভাষায় শেখানো হচ্ছে বর্ণমালা ও হাতের লেখা। শুধু পড়াশোনাই নয়, ছবি আঁকা, নাচ আর গানের ছন্দে নিজেদের রাঙিয়ে তুলছে এই শিশুরা।

স্কুলটির তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আরাফাত আলী আধো-আধো কণ্ঠে আনন্দ প্রকাশ করে বলে, এখানে এসে আমি পড়তে পারি, লিখতে পারি। এমনকি নাচতেও পারি। আমার খুব ভালো লাগে। আরেক শিক্ষার্থী সাবানা খাতুনের চোখে-মুখেও ছিল খুশির ঝিলিক। সে বলে, আমরা এখানে অনেক মজা করি। ছবি আঁকি, গান গাই, নাচতেও পারি। কথাগুলো শেষ করেই এক চিলতে মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে দেয় সে। পৌর এলাকার বাসিন্দা, স্থানীয় কাজী ও প্রভাষক কাজী নাজমুল ইসলাম বলেন, পুরো উপজেলায় এই ধরনের স্কুল মাত্র একটিই। ইতিমধ্যে স্কুলটি এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এলাকার মানুষের দাবি, স্কুলটিকে যেন দ্রুত সরকারিকরণসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়।

তবে এই আলোর পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প। প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও স্কুলটি এখনও এমপিওভুক্ত হয়নি। নিজের সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়ায় এই শিশুদের কষ্টটা মন থেকে অনুভব করেছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক আক্কাস আলী। সেই তাড়না থেকেই এই মহতী উদ্যোগ। কিন্তু স্কুলটিতে প্রধান শিক্ষকসহ যে ১৩ জন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োজিত আছেন, তাঁরা সবাই বিনা বেতনে নিরলসভাবে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।

প্রধান শিক্ষক আক্কাস আলী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, নিজেদের সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়ার পর থেকেই সমাজের এই অবহেলিত শিশুদের আলোর পথ দেখানোর স্বপ্নটা দেখি। কিন্তু বছরের পর বছর বিনা বেতনে পাঠদান করতে গিয়ে অন্য শিক্ষক এবং আমার নিজের সংসারেও তীব্র অভাব-অনটন লেগেই আছে। তিনি স্কুলটি দ্রুত এমপিওভুক্ত করার জন্য সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানান।

স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাশতুরা আমিনা বলেন, এই বিশেষ শিশুদের মাঝে কিছুটা সময় কাটাতে পেরে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। শিক্ষা উপকরণ ও খাবার পেয়ে শিশুদের মুখের ওই চিলতে হাসিটাই বড় প্রাপ্তি। তিনি আরও বলেন, স্কুলটিতে বিনা পয়সায় পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুরা খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ পাচ্ছে। আমার বিশ্বাস, পরম যত্ন পেলে এই অবহেলিত শিশুরা একদিন সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এবং এই অঞ্চলের নাম দেশজুড়ে উজ্জ্বল করবে।