ঢাকা | জুন ৫, ২০২৬ - ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

মরুর পশু দুম্বাকে বশ মানালেন চারঘাটের অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য

  • আপডেট: Thursday, June 4, 2026 - 10:00 pm

মোজাম্মেল হক, চারঘাট থেকে: চাকরি জীবন থেকে অবসর নিয়ে ঘরে বসে না থেকে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সাবেক সেনাসদস্য মেহেদী হাসান লিটন। উপজেলার সরদহ ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে শখের বশে শুরু করা তার মরুর দেশের দুম্বার খামার এখন বাণিজ্যিকভাবে সফলতার পথ দেখাচ্ছে। দেড় বছরের ব্যবধানে তার এই ব্যতিক্রমী খামার এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের এই দুম্বার খামার দেখতে এবং পরামর্শ নিতে।

সম্প্রতি সরেজমিনে খামারটি ঘুরে দেখা যায়, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত পরিবেশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে বিভিন্ন বয়সের দুম্বা। খামারের প্রতিটি প্রাণীর জন্য রয়েছে আলাদা পরিচর্যার ব্যবস্থা। উন্নত খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি ও নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার কারণে দুম্বাগুলো বেশ সুস্থ ও সবল হয়ে উঠেছে।

সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়ার পর মেহেদী হাসান লিটন কৃষিনির্ভর কিছু করার পরিকল্পনা করেন। বাংলাদেশে সাধারণত গরু-ছাগলের খামার বেশি দেখা গেলেও তিনি ভিন্ন কিছু করার কথা ভাবেন। সেই চিন্তা থেকেই মরুভূমির জলবায়ুর পশুকে এদেশের আবহাওয়ায় লালন-পালনের চ্যালেঞ্জ নেন তিনি। প্রায় দেড় বছর আগে মাত্র ৪টি দুম্বা কিনে যাত্রা শুরু করেন মেহেদী হাসান। শুরুর দিকে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করলেও কঠোর পরিশ্রম আর সঠিক ব্যবস্থাপনায় তিনি সফলতার মুখ দেখেছেন।

উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান লিটন জানান, খামারের শেড নির্মাণ এবং উন্নত জাতের ৪টি দুম্বা কেনাসহ শুরুতে তার আনুমানিক কয়েক লাখ টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয়েছিল। মাত্র দেড় বছরে সেই ৪টি দুম্বা থেকে বংশবৃদ্ধি পেয়ে খামারে এখন দুম্বার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১টিতে। এর মধ্যে একটি দুম্বা বিক্রয় করেন দেড় লাখ টাকায়। এদেশের সবুজ ঘাস, খড়, গম এবং ভুসি খাইয়েই এদের বড় করা হচ্ছে। ছাগল বা ভেড়ার মতোই সহজ উপায়ে এবং এদেশের আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে এদের লালন-পালন করা সম্ভব। খামারের দুম্বাগুলো বেশ পুষ্ট এবং সুস্থ-সবল হয়ে উঠেছে।

লাভের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে মেহেদী হাসান লিটনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, একেকটি দুম্বা লাখ টাকার বেশি মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব। রোগবালাই কম হওয়ায় এবং দ্রুত বংশবৃদ্ধি করায় দুম্বা পালন ছাগল-ভেড়ার চেয়েও অনেক বেশি লাভজনক। মেহেদী হাসান জানান, তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো খামারটি আরও বড় করা এবং স্থানীয় বেকার যুবকদের মাঝে দুম্বা পালনের প্রশিক্ষণ ও বাচ্চা সরবরাহ করে বালিয়াডাঙ্গা গ্রামকে একটি আদর্শ দুম্বা উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা।

মেহেদী হাসান বলেন, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও পরিশ্রম করার মানসিকতা আমাকে এই ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগে সাহস জুগিয়েছে। আমাদের দেশের আবহাওয়াতেই দুম্বা পালন সম্ভব, তা আমি বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে আমার খামারের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পেরেছি। মাত্র ৪টি থেকে এখন আমার ১১টি দুম্বা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রথম দিকে কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে ধৈর্য, প্রশিক্ষণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। এখন অনেকেই খামার দেখতে আসছেন এবং দুম্বা পালন সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

সরেজমিনে কথা হয় স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সাথে। তারা জানান, এলাকায় এ ধরনের আধুনিক দুম্বার খামার নেই। মেহেদী হাসানের উদ্যোগ চারঘাটে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মেহেদী হাসান লিটনের এই উদ্যোগ শুধু তার ব্যক্তিগত সফলতার গল্প নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভিএস ডা, তানভীর আনজুম অনিক এর সাথে কথা হলে তিনি জানান, চারঘাটের সরদহ ইউনিয়নে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মেহেদী হাসানের দুম্বার খামারটি একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগ। প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে তাকে নিয়মিত সব ধরনের চিকিৎসা, কৃমিনাশক ঔষধ সহ বিভিন্ন সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। দুম্বা পালনকে কেন্দ্র করে চারঘাটে যে নতুন সম্ভাবনার সূচনা হয়েছে, তার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মেহেদী হাসান। তার এই উদ্যোগ স্থানীয় যুবসমাজকে আত্ম কর্মসংস্থানের দিকে উদ্বুদ্ধ করবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।