আমের রাজধানীতে সম্ভাবনার সুবাস, নেই শিল্পের বিকাশ
ডাবলু কুমার ঘোষ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে: শুধু অর্থনীতিই নয়, যুগ যুগ ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষের আবেগের আরেক নাম ‘আম’। জেলার প্রধান অর্থকরী ফসলও এটি। এবার সব ধরনের প্রতিকূলতা কাটিয়ে বাগানে বাগানে দেখা দিয়েছে ভালো ফলনের আশা। শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। চলতি মাসের শেষ দিকেই বাজারে আসতে পারে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুস্বাদু আম।
সামনে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৪ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদন হবে। আর এ থেকে প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার আম বাণিজ্যের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দেশের এক-তৃতীয়াংশ আম এই জেলায় উৎপাদিত হলেও পণ্যটিকে ঘিরে এখানে গড়ে ওঠেনি বড় কোনো শিল্প। সংশ্লিষ্টদের মতে-প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ আর বিনিয়োগের অভাবে সম্ভাবনাময় এই খাতটি এখনো অবহেলিত রয়ে গেছে।
বছর ঘুরে আবারও এসেছে আমের মৌসুম। থোকায় থোকায় ঝুলছে নানা জাতের আম, যার সঙ্গে ঝুলছে হাজারো চাষির স্বপ্ন। গ্রীষ্ম এলেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ যেন হয়ে ওঠে এক সুবাসিত জনপদ। যেখানে আম শুধু একটি ফল নয়; বরং আবেগ, অর্থনীতি আর বেঁচে থাকার গল্প। কিন্তু এই গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য সঙ্কট। গত দুই দশকে জেলায় ফলটির বাণিজ্যিক আবাদ ও উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে; কিন্তু সেই অনুপাতে বদলায়নি আমচাষিদের ভাগ্য। প্রতিবছর আম আসে, আবার মৌসুম শেষে চলেও যায়। কিন্তু এই সমৃদ্ধির গল্পে চাষির মুখে হাসি ফোটে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াছিন আলী জানান, আম পাড়া ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে চলতি বছরেও কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি জেলা প্রশাসন। আম পরিপক্ক হলেই গাছ থেকে পাড়া যাবে। তবে কেউ যদি রাসায়নিক ব্যবহার করে অপরিপক্ক আম বাজারজাত করে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, আধুনিক ও উন্নত পদ্ধতি এবং বাণিজ্যিক আমচাষে নতুন নতুন উদ্যোক্তা এগিয়ে আসায় গত ১০ বছরে জেলায় প্রায় ১৩ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ বেড়েছে। এ বছর জেলার ৫টি উপজেলায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আমের চাষ হয়েছে। আবাদকৃত জমিতে মোট আমগাছের সংখ্যা ৮ লাখ ৫২ হাজার ৪৯০টি। সামনে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না এলে এবার জেলায় আমের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
কানসাটের আমচাষি রবিউল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিবছর উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে। কিন্তু বাজারে আমের দামের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ১০ বছর আগে আমের যে দাম ছিল, আজও অনেক ক্ষেত্রে সেই একই দামেই আম বিক্রি করতে হচ্ছে। গোমস্তাপুরের বাগান মালিক আশরাফুল ইসলাম জানান, সারাবছর আমচাষ, অতি ঘন চাষ পদ্ধতি (আল্ট্রা হাই ডেনসিটি) এবং বাণিজ্যিকভাবে আমচাষে নতুন নতুন উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসায় উৎপাদন অনেক বেড়েছে। জেলায় বর্তমানে প্রতিবছর ৫ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হচ্ছে। এই আম প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিদেশে রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো গেলে এ খাত থেকে বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।
আমচাষের সম্ভাবনা নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক বলেন, বিশ্বজুড়ে যখন কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, তখনো আমরা পিছিয়ে আছি। বিশ্ববাজারে আমভিত্তিক পণ্যের বাজার যেখানে প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের, সেখানে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে বড় ধরনের কোনো আমভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠেনি।
শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল শাহ শামিম জানান, আম ব্যবসার প্রধান অন্তরায় হলো এখনো সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে বড় মাপের কোনো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে না ওঠা। আম থেকে জুস, জেলি, আমসত্ত্ব, আমের পাউডার, ম্যাংগো বার ও আমচুরসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। অথচ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, স্বল্প পরিসরে কিছু উদ্যোক্তা কাজ করলেও প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বিনিয়োগের অভাবে তারা বড় পরিসরে এগোতে পারছেন না।
এদিকে ম্যাংগো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব ও উদ্যোক্তা আহসান হাবীব জানান, আধুনিক প্যাকেজিং হাউস স্থাপন, হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, রপ্তানিমুখী জোন চিহ্নিতকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন না হওয়ায় এই জেলার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক খাত আমশিল্পের বিকাশ ঘটছে না। তরুণ উদ্যোক্তাদের আম রপ্তানি, বাজারজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা না থাকাকেই দুষছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ।
তিনি বলেন, দেশের আম ও আমশিল্পের টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি দেশের ই-কমার্সের ক্ষেত্রে সরকার ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসলে এই খাতটি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমের রাজধানীতে বিপুল সম্ভাবনা আছে, কিন্তু অভাব শুধু সঠিক পরিকল্পনার। আমকে ঘিরে শিল্প গড়ে উঠলেই বদলে যেতে পারে এ অঞ্চলের হাজারো মানুষের ভাগ্য।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াছিন আলী আরও জানান, গত বছর এ জেলায় ১২২ জন আমচাষি ‘উত্তম কৃষি চর্চা’ (এঅচ) মেনে বিশ্বের ২১টি দেশে ৮৩৯ মেট্রিক টন আম রপ্তানি করেছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের (আম গবেষণা কেন্দ্র) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরফ উদ্দিন বলেন, ভৌগোলিক স্বীকৃতি (জিআই) ও সুস্বাদু আমের উৎপত্তিস্থল হিসেবে এই জেলা দেশজুড়ে প্রসিদ্ধ। প্রতিবছর এই জেলার মানুষ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ মেট্রিক টন আম ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করে থাকে।
এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে তরুণ উদ্যোক্তারা রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশেও আম রপ্তানি করছেন। তিনি আরও যোগ করেন, আধুনিক সংরক্ষণাগার (কোল্ড স্টোরেজ) ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুবিধা না থাকায় প্রতিবছর জেলায় হাজার হাজার টন আম নষ্ট হয়। যা হতে পারত মূল্যবান রপ্তানি পণ্য, তা এখন অপচয়ে পর্যবসিত হচ্ছে। সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপন, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক বাজার ব্যবস্থা ও রপ্তানি সুবিধা বাড়ানো গেলে আমকেন্দ্রিক পুরো খাতের চিত্রই বদলে যাবে।











