ঢাকা | মে ১৮, ২০২৬ - ১১:৪৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম

বরেন্দ্রে পানির স্তরে ধস: সুপেয় জলের তীব্র হাহাকার

  • আপডেট: Monday, May 18, 2026 - 11:17 pm

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ সামগ্রিক বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে তীব্র পানির সংকট। জলবায়ু পরিবর্তন, আশঙ্কাজনক হারে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব এবং অনিয়ন্ত্রিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও জয়পুরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এ অঞ্চলকে সরকার পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করলেও বাস্তবে সরকারি বিধিনিষেধের তোয়াক্কা করছে না কেউ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ দিয়েও পানি উঠছে না। ফলে যেমন বাড়ছে কৃষি উৎপাদন ব্যয়, তেমনি অনাবাদি হয়ে পড়ছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে সুপেয় পানির; অনেক এলাকায় খাবার পানির জন্য মানুষকে মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের প্রায় এক কোটি মানুষ এখন সরাসরি পানিসঙ্কটের মুখোমুখি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ৬ নভেম্বর প্রকাশিত সরকারি গেজেটে খাবার পানি ছাড়া অন্য যেকোনো কাজে আগামী ১০ বছরের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হয়। ‘পানি আইন-২০১৩’ অনুযায়ী, সেচ বা শিল্পকারখানায় গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ এবং নতুন নলকূপ স্থাপনেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনার কোনো কার্যকারিতা নেই। আবাসিক বিদ্যুৎসংযোগ ব্যবহার করে অনেকেই অবৈধভাবে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে দিন-রাত ধানখেতে সেচ দিচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসনের নামমাত্র নজরদারি থাকলেও বাস্তবে এই অবৈধ উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না।

নামছে পানির স্তর: পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫-৯০ সালের দিকে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির স্তর ছিল মাটির মাত্র ২৬ থেকে ৩০ ফুট নিচে। ১৯৯৪ সালে তা ৩৫ ফুটে, ২০০৪ সালে ৫১ ফুটে এবং ২০১৩ সালে ৬০ ফুটে নেমে যায়। বর্তমানে বহু এলাকায় পানির স্তর ৮০ থেকে ৯০ ফুটের নিচে চলে গেছে। কোথাও কোথাও ১১৩ ফুট, এমনকি ২০০ ফুট গভীরে খনন করেও পানির দেখা মিলছে না। এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮০ সালে যেখানে পানির স্তর ছিল ৩৯ ফুট নিচে, ২০১৬ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ১১৮ ফুটে। বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে সামান্য পানির স্তর থাকলেও তা সাধারণ গভীর নলকূপে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।

গবেষকদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চল দেশের সবচেয়ে শুষ্ক ও উষ্ণ এলাকা। গ্রীষ্মকালে এখানকার তাপমাত্রা প্রায়ই ৪০ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। ১৯৬৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত দুই দশকে বৃষ্টির পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। বছরের দীর্ঘ সময় অনাবৃষ্টির কারণে মাটির নিচে পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ (রিচার্জ) হচ্ছে না। গবেষকদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে বৃষ্টিপাত আরও কমে গেলে এই সংকট স্থায়ী রূপ নিতে পারে।

নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেসরকারি পাম্প: বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নিয়মে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০ গভীর নলকূপের অনুমতি থাকলেও বর্তমানে বেসরকারি উদ্যোগে হাজার হাজার শ্যালো ও গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। ফলে মাটির নিচের মূল পানির আধার বা অ্যাকুইফার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, বিএমডিএ মাত্র ২৭ শতাংশ পানি উত্তোলন করে। বাকি সিংহভাগ পানিই তোলা হচ্ছে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাম্পের মাধ্যমে, যা কার্যত আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তিনি আরও জানান, ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে বিএমডিএ বিভিন্ন সেচ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। খাল, পুকুর ও জলাশয় পুনঃখননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুধু আইনের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, বরং টেকসই বিকল্প ব্যবস্থা এবং কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি ছাড়া এই মহানিয বিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।