ঢাকা | মে ১৫, ২০২৬ - ১২:২০ পূর্বাহ্ন

ঈদ মার্কেটে ও পশুর হাটে ছড়াচ্ছে জাল নোট, রাজশাহীতেও সক্রিয় চক্র

  • আপডেট: Thursday, May 14, 2026 - 10:38 pm

জগদীশ রবিদাস: আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্যামিতিক হারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল নোট কারবারি চক্র। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), র‌্যাব ও স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, ঈদের কেনাকাটার ভিড় ও পশুর হাটকে টার্গেট করে বাজারে বিপুল পরিমাণ জাল নোট ছাড়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেছে একাধিক চক্র। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নিখুঁতভাবে তৈরি এসব জাল নোট সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজে চেনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মার্কেট ও পশুর হাটে কেনাকাটা করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতা, ব্যবসায়ী ও খামারিরা।

শপিং মল থেকে পশুর হাট:

সর্বত্রই জালের বিস্তার: রাজশাহী মহানগরীর আরডিএ মার্কেট, নিউ মার্কেট, থিম ওমর প্লাজার মতো বড় বড় শপিং মলগুলোতে এখন ঈদের কেনাকাটায় ভিড় বাড়ছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চক্রের সদস্যরা সুকৌশলে ৫০০ ও ১০০০ টাকার জাল নোট বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে। শুধু শপিং মলই নয়, জাল নোট চক্রের মূল লক্ষ্য এখন রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিটি পশুর হাটসহ বিভিন্ন উপজেলার পশুর হাটগুলো। হাটের তীব্র ভিড়, আলো-আঁধারি পরিবেশ এবং তাড়াহুড়োর সুযোগ নিয়ে বিক্রেতা ও খামারিদের হাতে জাল টাকা গুঁজে দিচ্ছে সিন্ডিকেটের সদস্যরা। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা অনেক খামারি ব্যাংকিং লেনদেনে অভ্যস্ত না হওয়ায় বা জাল নোট চেনার উপায় না জানায় সহজেই প্রতারিত হচ্ছেন। তারা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারছেন ব্যাংকে টাকা জমা দিতে গিয়ে কিংবা অভিজ্ঞ কারও শরণাপন্ন হয়ে।

কৌশল বদলাচ্ছে চক্র, কোটি টাকার মিশন:

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে জালিয়াত চক্রগুলো বারবার তাদের রুট ও কৌশল বদলাচ্ছে। পুলিশ বা ডিবি যখন তাদের পুরোনো কৌশল ধরে ফেলছে, ততক্ষণে তারা নতুন প্রযুক্তির আশ্রয় নিয়ে বাজারে টাকা ছেড়ে দিচ্ছে। মূলত ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের মৌসুমকে জাল টাকার ‘ব্যবসায়িক সিজন’ হিসেবে গণ্য করে এই অপরাধীরা। কারণ ঈদের আগে শপিং মল ও পশুর হাট মিলিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার নগদ লেনদেন হয়। সম্প্রতি র‌্যাব-৩-এর একটি দল রাজধানীর তুরাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে নাইমুল ইসলাম ইশান (১৯) ও কেফায়েত উল্লাহ (১৯) নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের কাছ থেকে ২৫ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকার জাল নোটসহ ল্যাপটপ, লেজার প্রিন্টিং ডাইস ও উন্নতমানের প্রিন্টার উদ্ধার করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র; এমন শত শত ছোট-বড় কারখানা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ও সীমান্ত এলাকায় গড়ে উঠেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাল টাকার এই অবৈধ ব্যবসার সাথে মাদক ও চোরাচালান চক্রের গভীর সংযোগ রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে মাদক আনার পর অর্থ পরিশোধের সময় কৌশলে জাল টাকা ব্যবহার করা হয়, যা পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের পকেটে চলে আসে। দুঃখজনক বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ের দু-চারজন সদস্য গ্রেপ্তার হলেও জালিয়াত চক্রের মূল হোতা বা গডফাদাররা বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এমনকি সুনির্দিষ্ট ছাপাখানাগুলোর সন্ধানও সহজে মিলছে না। মাঠপর্যায়ের সদস্যরা ধরা পড়লেও আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে কিংবা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের তদবিরে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসছে এবং পুরোনো অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পুনরায় একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।

রাজশাহীতে নজরদারি ও সতর্কবার্তা:

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) এবং জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদ ও পশুর হাটকে কেন্দ্র করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ শপিং মল ও পশুর হাটগুলোতে জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ বসানোর প্রক্রিয়া চলছে। ডিবি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, ঈদ সামনে রেখে জালিয়াত চক্র, ছিনতাইকারী, অজ্ঞানপার্টি ও মলমপার্টির তৎপরতা বন্ধে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ব্যাংক, এটিএম বুথ এবং বড় শপিং মলগুলোর সামনে পুলিশি টহল নিয়োজিত রয়েছে। পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঈদের বাজারে লেনদেনের সময় টাকার ওপরের নিরাপত্তা সুতা, জলছাপ এবং নোটের খসখসে ভাব ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেয়া উচিত। সন্দেহ হলে নিকটস্থ পুলিশ বক্স বা ব্যাংকের বুথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।