ঢাকা | মে ৫, ২০২৬ - ২:৫৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

পুঠিয়ায় পুরাকীর্তির বুকে ক্ষত: ঐতিহ্যের ‘নিতাই সিং বাড়ি’র ইট এখন বাজারে!

  • আপডেট: Monday, May 4, 2026 - 10:00 pm

স্টাফ রিপোর্টার ও পুঠিয়া প্রতিনিধি: রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ির ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলীর মাঝে যেন এক বিষফেঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি দ্বিতল ভবন। যার এক পাশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ‘বড় শিবমন্দির’ আর অন্য পাশে ‘দোল মন্দির’। মাঝখানের এই ঐতিহাসিক ভবনটি, যা জনশ্রুতিতে রাজপরিবারের দ্বাররক্ষী নিতাই সিংয়ের আবাস হিসেবে পরিচিত, সেটি এখন এক ব্যক্তির লোভের শিকারে পরিণত হয়েছে।

প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা আর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চোখরাঙানিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভবনটি ভেঙে ইট বিক্রির মহোৎসবে মেতেছেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই ধ্বংসলীলা এখন শেষ পর্যায়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাজবাড়ি জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান যখন দাপ্তরিক কাজে বাইরে ছিলেন, ঠিক সেই সুযোগেই মনিরুল ইসলাম ওরফে সাবু নামে এক ব্যক্তি শ্রমিক লাগিয়ে ভবনটি ভাঙা শুরু করেন। বাধা দেয়া হলেও তিনি প্রতিশ্রুতি ভেঙে দ্বিগুণ শ্রমিক লাগিয়ে কাজ চালিয়ে যান। এমনকি উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে শ্রমিক আটক এবং মুচলেকা দেয়ার পরও থেমে নেই এই ধ্বংসযজ্ঞ।

পুরাকীর্তি আইন ১৯৬৮ (সংশোধিত ১৯৭৬) অনুযায়ী, সংরক্ষিত কোনো নিদর্শনের আশেপাশে নির্মাণ বা পরিবর্তন দণ্ডনীয় অপরাধ। ভবনটির মাত্র ১০ মিটারের মধ্যে শিবমন্দির এবং ৫ মিটারের মধ্যে দোল মন্দির অবস্থিত। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে সংরক্ষিত তালিকার অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করলেও, সেই প্রজ্ঞাপন জারির আগেই নিদর্শনটি নিশ্চিহ্ন করে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন দখলদার।

মনিরুল ইসলামের দাবি, এটি তার পৈতৃক সম্পত্তি এবং তার দাদা এক মাড়োয়ারির কাছ থেকে এটি কিনেছিলেন। তবে রাজবাড়ির সীমানার ভেতরে কীভাবে ব্যক্তিগত মালিকানা সৃষ্টি হলো এবং কোন মাড়োয়ারির কাছ থেকে এটি কেনা হয়েছে, তার সদুত্তর মেলেনি।

আলোচিত এই ভবনটির আইনি অবস্থা জানতে গত শনিবার স্থানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মন্ডল কাস্টডিয়ানকে ডেকে পাঠান। আইনের ব্যাখ্যা শুনে সংসদ সদস্য সন্তোষ প্রকাশ করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর পরদিনই (রোববার) সকালে মনিরুল ইসলাম পুনরায় বাড়ির অবশিষ্টাংশ ভাঙতে শ্রমিক নামান।

পুঠিয়া রাজবাড়ি জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান হাফিজুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলেও যদি তার প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য থাকে, তবে তিনি তা ধ্বংস করতে পারেন না। তাকে বারবার মৌখিকভাবে নিষেধ করা হয়েছে এবং তিনি মুচলেকাও দিয়েছেন। তারপরও তিনি আইন অমান্য করছেন।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ির ১০০ একর জমির মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ একর তাদের দখলে আছে। বাকি প্রায় ৮০ ভাগ জমিই স্থানীয় দখলদারদের কবলে। এই দখলদারিত্বের কারণেই একের পর এক ঐতিহাসিক নিদর্শন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

পুঠিয়ার সাধারণ মানুষ ও ইতিহাসপ্রেমীদের দাবি, শুধু মুচলেকা বা মৌখিক নিষেধ নয়, যারা জাতীয় ঐতিহ্য ধ্বংস করে ইট বিক্রি করছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই পুঠিয়া রাজবাড়ির শেষ চিহ্নটুকুও বিলীন হয়ে যাবে।