ঢাকা | এপ্রিল ২০, ২০২৬ - ১:৫৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

হামে মৃত্যুর এক দিন পর আইসিইউতে ডাক পেল গৌরী

  • আপডেট: Sunday, April 19, 2026 - 10:15 pm

স্টাফ রিপোর্টার: শরীরে হামের উপসর্গ নিয়ে শ্বাসকষ্টে ছটফট করছিল ছয় মাসের শিশু গৌরি। চিকিৎসক দ্রুত তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু গৌরির আগে আরও ২৬টি শিশু অপেক্ষা করছিল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসিইউর একটি শয্যার জন্য। দুই দিন অপেক্ষা করেও আইসিইউ না পাওয়া গৌরি মারা গেছে গত শনিবার।

পরদিন রোববার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার বাবাকে ফোন করে জানায়, গৌরির আইসিইউর সিরিয়াল এসেছে। সন্তানহারা বাবা জানিয়ে দিয়েছেন, এখন আর আইসিইউ লাগবে না গৌরির, সে সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে।

জানা গেছে, শিশু গৌরি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার চাঁইপাড়া গ্রামের সোহাগ কুমারের মেয়ে। তার মায়ের নাম বন্দনা রানী। গৌরি ছিল তাঁদের প্রথম সন্তান। রামেক হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল দুপুরে গৌরি মারা যায়। এর আগে গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

গৌরির বাবা সোহাগ কুমার জানান, তাঁরা বাড়িতেই মেয়ের শরীরে হাম দেখেন। জ্বর ছাড়ছিল আর আসছিল। এই অবস্থায় গত বুধবার তাঁরা গৌরিকে নিয়ে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখান থেকে তাকে রামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করে দেয়া হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে মেয়ের প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন চিকিৎসক আইসিইউতে সিরিয়াল দিয়ে আসতে বলেন। তিনি আইসিইউতে ছুটে যান। তখন গৌরির সিরিয়াল পড়ে ২৭।

সোহাগ কুমার আরও জানান, এরপর দুদিন ধরেই অক্সিজেন চলছিল। গৌরি মারা যাওয়ার আধা ঘণ্টা আগে তার কষ্ট তিনি সহ্য করতে না পেরে আবার আইসিইউতে ছুটে যান। তখন আইসিইউ থেকে তাঁকে বলা হয়, আইসিইউর জন্য যারা সিরিয়াল দিয়েছে, তারা প্রত্যেকে মুমূর্ষু। সিরিয়াল ভেঙে কাউকে আইসিইউতে নেয়া যাবে না। হতাশ হয়ে তিনি ওয়ার্ডে ফেরেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর মেয়ে মারা যায়। এরপর তাঁরা মেয়ের মরদেহ নিয়ে বাড়িতে ফেরেন।

সোহাগ বলেন, ‘ডাক্তাররা খুব আন্তরিক। তাঁরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারেননি। রোববার দুপুরে আমাকে আইসিইউ থেকে ফোন করা হয়েছিল। গৌরির সিরিয়াল এসেছে বলে আমাকে জানানো হয়। আমি জানিয়ে দিই যে, আমাদের আর আইসিইউ লাগবে না। আমাদের গৌরি সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে।’ সোহাগ কুমার আরও বলেন, ‘আমার কারও ওপর কোনো অভিযোগ নেই। আমি কোথাও অভিযোগ করিনি। শুধু একটাই দাবি রাখব, শিশুদের জন্য যেন আইসিইউতে বেড বাড়ানো হয়। আর আইসোলেশন ওয়ার্ডে যেন রোগী কম রাখে। কারণ, সেখানে এত বেশি রোগী যে, কোনো বাচ্চা একটু সুস্থ হলেও অন্য বাচ্চা আক্রান্ত থাকার কারণে অন্য বাচ্চাটারও সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে।’

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে ১৩২টি শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে গত শনিবার সকাল থেকে গতকাল রোববার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ১০টি শিশু ভর্তি হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছে ২৬টি শিশু। হামের সংক্রমণ শুরুর পর এ পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ৬৬১টি শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি মারা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে শুধু শিশু গৌরির মৃত্যু হয়।

এর আগে গত মার্চে হামের উপসর্গ নিয়ে নেহা নামের দুই মাসের একটি শিশুকে একই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সে সময় শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসক তাকে পিআইসিইউতে (শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নেয়ার পরামর্শ দেন। নেহার অভিভাবক দ্রুত পিআইসিইউতে গিয়ে সিরিয়াল দেন। কিন্তু পিআইসিইউর জন্য অপেক্ষাধীন থাকা অবস্থায়ই শিশুটির মৃত্যু হয়। শিশুটির মরদেহ নিয়ে মা-বাবা যখন বাড়ির পথে, তখন পিআইসিইউ থেকে নেহার মা চামেলীর মোবাইল ফোনে কল আসে। সেখানে বেড খালি হওয়ায় নেহাকে নিয়ে তাঁরা পিআইসিইউতে আসতে বলেন। শুধু গৌরি, নেহা নয়, রামেক হাসপাতালে আইসিইউর শয্যাসঙ্কটে মার্চের শেষ দুই সপ্তাহে চিকিৎসাধীন ৪৪টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।