ঢাকা | অক্টোবর ১৯, ২০২৬ - ১:১৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

কৃষিতে নতুন আশার আলো: রাজশাহীতে প্রথমবারের মতো ‘ব্ল্যাক রাইস’ চাষ

  • আপডেট: Sunday, October 18, 2026 - 11:20 pm

স্টাফ রিপোর্টার: সবুজ ও সোনালি ধানের চিরাচরিত রূপ ডিঙিয়ে রাজশাহীর দুর্গাপুরে এবার বাতাসে দুলছে পুষ্টিগুণে ভরা ব্যতিক্রমী জাতের ‘ব্ল্যাক রাইস’ বা কালো চালের ধান। জেলাটিতে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ পরীক্ষামূলকভাবে বিশেষ এই ধানের আবাদ শুরু হয়েছে। সাধারণ চালের তুলনায় বাজারে এর চড়া দাম ও বিশাল চাহিদা থাকায় নতুন এই উচ্চমূল্যের ফসলকে ঘিরে স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রের বরাতে জানা যায়, দুর্গাপুর পৌরসভার দেবীপুর গ্রামের উদ্যমী তরুণ সোহান ১৬ কাঠা জমিতে এবং মাড়িয়া ইউনিয়নের পালি গ্রামের কৃষক আবু তালেব আড়াই বিঘা জমিতে এ বছর ব্ল্যাক রাইসের চাষ শুরু করেছেন। তাঁদের দেখাদেখি উপজেলার আরও কয়েকজন কৃষক এই নতুন জাতের ধানের দিকে ঝুঁকছেন।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ শুরু থেকেই এসব জমি পর্যবেক্ষণ, ফলন বৃদ্ধি ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের আশা, প্রথমবারের এই চেষ্টা সফল হলে দুর্গাপুরে প্রচলিত ধানের জায়গায় বিকল্প এই লাভজনক ফসলের বৈচিত্র্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

নতুন ফসল আবাদ সম্পর্কে কৃষক আবু তালেব জানান, এলাকায় এই ধান সম্পূর্ণ অচেনা হওয়ায় ঝুঁকি এড়াতে তিনি প্রথমে আড়াই বিঘায় চাষ শুরু করেছেন। ফলন ও বাজারদর কাঙ্ক্ষিত হলে তাঁরা বড় ধরনের লাভ দেখতে পাবেন, যা দেখে অন্য কৃষকেরাও এই ধান চাষে উৎসাহিত হবেন।

অন্যদিকে তরুণ উদ্যোক্তা সোহান বলেন, নতুন কিছু শেখা ও ভালো বাজারমূল্যের সম্ভাবনা দেখেই তিনি ব্ল্যাক রাইস চাষে নেমেছেন। চাষের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় শেষে ফলন ভালো হলে ভবিষ্যতে বড় পরিসরে এর আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। অবশ্য আরেক কৃষক সোবহান আলী মনে করেন, নতুন ধানের জাতের ক্ষেত্রে বাজারজাতকরণ ও ফলন নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকলেও দর ভালো থাকলে এটি হবে কৃষকদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক বিকল্প ফসল।

কৃষকদের হিসেব বলছে, প্রতি বিঘায় প্রায় ১৬ থেকে ১৮ মণ পর্যন্ত ব্ল্যাক রাইসের ফলন হতে পারে। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ধান চার হাজার টাকা হারে বিক্রি করা সম্ভব হলে বিঘাপ্রতি আয় হতে পারে ৬৪ থেকে ৭২ হাজার টাকা পর্যন্ত। যদিও প্রকৃত লাভ কতখানি টিকবে, তা নির্ভর করবে ফসল তোলার পর চূড়ান্ত ফলন ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।

কৃষি বিভাগের মাঠ কর্মকর্তা রফিকুল হেলালী জানান, কৃষকদের শুরু থেকেই হাতে-কলমে পরিচর্যা, রোগবালাই দমন ও ধান কাটার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। স্থানীয় চাল ব্যবসায়ী হাবিব মিয়ার মতে, ব্ল্যাক রাইসের পৃথক একটি ক্রেতাশ্রেণি থাকলেও নিয়মিত বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী জানান, কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পৌরসভা ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ এবং পালি ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুমিনুজ্জামানের সরাসরি পর্যবেক্ষণে খেতের পরিচর্যা চলছে এবং এবারের ফলন পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে এর পরিধি বাড়ানো হবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিজ্ঞান মতে, ব্ল্যাক রাইসে ‘অ্যান্থোসাইয়ানিন’ নামের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও উচ্চ পুষ্টিগুণ থাকার কারণে এর চাল কালো বা গাঢ় বেগুনি দেখায়, যার কারণে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের কাছে এর ব্যাপক কদর রয়েছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, এই চাষ রাজশাহীর কৃষিতে একটি ইতিবাচক মোড়। তবে নতুন জাত হওয়ায় ফলন ও বাজার সমন্বয়ের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে ধীরে ধীরে আবাদ সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন তিনি।

অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান জানান, শুধু উচ্চ দাম নয়, বরং প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্থায়িত্ব ও বাজার ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলেই ব্ল্যাক রাইসের বাণিজ্যিকভাবে বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে।