বর্ষা বিদায় হলেও বৃষ্টির অভাবে পুড়ছে আমন খেত
নিয়ামতপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: বাংলা দিনপঞ্জির হিসেবে এখন শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্রের শুরু। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে সাধারণত আষাঢ়-শ্রাবণেই ভারি মৌসুমি বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু এবার বর্ষার বিদায় ঘণ্টা বাজলেও ধান উৎপাদনে সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে খ্যাত নওগাঁয় স্বাভাবিক বৃষ্টির দেখা নেই।
এবার আমন আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে চারা রোপণের সময়ও হয়নি কাঙ্খিত বৃষ্টি। ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে আমন চাষিরা চারা রোপণ করে। দীর্ঘ অনাবৃষ্টিতে এখন জমিতে লাগানো সেই চারা বাঁচাতে কৃষকদের ভরসা ভূগর্ভস্থ পানি। কিন্তু বিদ্যুতের ঘনঘন লোড শেডিং এর কারণে সে আশাও হতাশায় রূপ নিয়েছে। এছাড়াও বর্ষানির্ভর আমন চাষে অনাবৃষ্টির কারণে সেচ দিতে খরচ বাড়ছে কৃষকের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিয়ামতপুর উপজেলার ৮ ইউনিয়নেই কমবেশি খরার কবলে পড়েছে আমন চাষ। এর মধ্যে রসুলপুর, হাজিনগর ও পাঁড়ইল ইউনিয়নের অবস্থা বেশি খারাপ। বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মৌসুমের শুরু থেকেই কৃষকেরা গভীর-অগভীর সেচযন্ত্র ব্যবহার করে আমনের চারা লাগিয়েছেন। লোডশেডিংয়ের কারণে সঠিক সময়ে জমিতে সেচ দিতে না পারায় আমনের খেত ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বরেন্দ্র বহুমুখী কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিয়ামতপুর সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৩০ হাজার ১শ ৪৯ হেক্টর জমিতে আমনের চাষ হয়েছে। এসব জমিতে সেচের জন্য মাঠে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার সেচযন্ত্র। এর মধ্যে এক হাজার ৫শ ৬০টি বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র। বিএমডিএর গভীর নলকূপ রয়েছে ৫৮০টি। বাকি সেচযন্ত্র ডিজেলচালিত। খরা মোকাবিলায় বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের প্রায় সবগুলোই চালু রয়েছে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন এক বিঘা জমিতে বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে সেচ দিতে বর্তমানে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ছে। আমনের চারা লাগানোর জন্য জমি প্রস্তুত ও খরার কবলে পড়া আমনের চারা বাঁচাতে ইতিমধ্যে কমপক্ষে দুইবার সেচ দিতে হয়েছে। এই মৌসুমে এভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত চললে কমপক্ষে আরও ছয়বার সেচ দিতে হবে। সেই হিসেবে উপজেলার ৩০ হাজার হেক্টর আমনের ফসল রক্ষায় এবার সেচের খরচ বাবদ ব্যয় হবে প্রায় অর্ধকোটি টাকা।
কৃষকরা বলছেন, জুনের শেষ সপ্তাহ ও জুলাইয়ের প্রথম চার-পাঁচ দিন প্রায় প্রতিদিনই বৃষ্টি হয়েছিল। মাঠের অনেক জমিতে পানিও জমে গিয়েছিল। কিন্তু তখন জমি প্রস্তুত না হওয়ায় ও বীজতলার চারার বয়স কম থাকায় কৃষকেরা ধানের চারা লাগাতে পারেনি। সাধারণত জুলাইয়ের এক-দুই সপ্তাহ পর থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আমনের চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়। এখন বৃষ্টির দরকার, কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই। গত ১৫-২০ দিন ধরে নওগাঁয় ভারী বৃষ্টি হয়নি। এই সময়ে কখনো টিপটিপ, কখনো একপশলা বৃষ্টি হলেও বর্ষানির্ভর আমন চাষের জন্য তা যথেষ্ট নয়।
নিয়ামতপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের আক্কেলপুর গ্রামের কৃষক বশির বলেন, গত ১৫ দিন ধরে আমাদের এলাকায় একপশলা বৃষ্টিও হয়নি। বর্তমানে আমনের জমির মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। যেসব জমিতে চারা লাগানো হয়েছে পানির অভাবে ওই সব চারা মরে যেতে বসেছে। খরার কারণে মাটি শুকনা কাঠের মতো হয়ে থাকায় সেচ দিয়ে মাটি ভেজাতে অনেক বেশি পানি লাগছে।
একদিকে খরা আরেক দিকে চলছে লোডশেডিং ও সার সঙ্কট। এমন অবস্থায় আমন চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। একই এলাকার ঘুঘুডাংগা গ্রামের কৃষক ইসমাইল বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করেও কাক্সিক্ষত বৃষ্টি না হওয়ায় সেচ দিয়ে জমি প্রস্তুত করে এ বছর ৮ বিঘা জমিতে আমনের চাষ করেছেন। সেই চারা এখন পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ছে। মাঠের মাটি ফেটে যাচ্ছে। বিএমডিএর গভীর নলকুপ চালু থাকলেও চাহিদামত পানি পাচ্ছেন না তিনি। সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে দিনের পর দিন।
এমন চলতে থাকলে আমন চারা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। দামপুরা গ্রামের বাসিন্দা ফয়সাল। তিনি বিএমডিএর গভীর নলকূপের অপারেটর। তিনি বলেন, আগে এক বিঘা জমিতে পানি দিয়ে ভেজাতে ১৫০-২০০ টাকা করে খরচ পড়তো। কিন্তু ঘনঘন লোড শেডিংয়ের কারণে এর খরচও বেড়েছে। তাছাড়া সেচের সিরিয়াল পেতে হুড়োহুড়ি লেগেই থাকছে কৃষকের মাঝে।
কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টিপাত কিছুটা কম হলেও আমনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে এখনই অতটা চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। আগস্ট মাসজুড়েই রয়েছে বৃষ্টির সম্ভাবনা। আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যে বৃষ্টি হলে চিন্তামুক্ত হবেন কৃষক। তবে যেসব কৃষক সেচ দিয়ে চাষাবাদ করছেন তাদের খরচ বাড়বে। গত বছরেও মৌসুমের শুরুতে তেমন বৃষ্টি ছিল না। তবে শেষের দিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয়েছিল। আশা করছি, এবারো আবহাওয়া অনুকূলে থাকবে।











