রাবিতে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি সংবলিত বিলবোর্ড, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্যারিস রোডে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের সংগঠন ‘নভো কালচার’-এর উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত কয়েকজন নেতার ছবি সংবলিত বিলবোর্ড টাঙানোকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিলবোর্ডটি অপসারণ এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
গত শনিবার ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ শিরোনামে বিলবোর্ডটি টাঙানো হয়। এতে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া ওই বিলবোর্ডে শাপলা চত্বরের অভিযান, জুলাই আন্দোলন, লগি-বৈঠা তাণ্ডব, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, কোটা আন্দোলন ও আয়নাঘরসহ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের সঙ্গে দেখা করে বিলবোর্ডটি অপসারণের দাবি জানান ক্রিয়াশীল কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের মুখপাত্র ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিংবা বাংলাদেশের কোথাও রাজাকারদের কোনো ধরনের স্বাভাবিকীকরণ আমরা মেনে নেব না।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নটি বাংলাদেশের একটি মৌলিক জাতীয় ইস্যু। ২০২৪ সালের আন্দোলন কিংবা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধী মতাদর্শ বা তাদের পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নেই। ২০২৪-কে আশ্রয় করে জামায়াত-শিবির তাদের রাজনীতি ও আদর্শকে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে এবং আমরা এর তীব্র বিরোধিতা করছি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন, প্রচারপত্র বিতরণ এবং দলীয় কর্মসূচি পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে অতীতের অপ্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ইস্যু জুড়ে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা আমরা দেখি না। এটি কেবল রাজনৈতিক বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করার একটি অপচেষ্টা। যুদ্ধাপরাধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, ১৯৭১ সালে আল-বদর ও রাজাকার বাহিনীর চিহ্নিত সদস্যদের আমরা ঘৃণাভরে স্মরণ করি। ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন বা তাদের ঘিরে বিতর্কিত ন্যারেটিভ তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি যোগ করেন, নভো কালচারের প্রতিষ্ঠাতা রাকসুর সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় এখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও উঠেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
অভিযোগের বিষয়ে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও নভো কালচারের পরিচালক সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, নভো কালচারের বিলবোর্ডে যাদের ছবি রয়েছে, তাদের কয়েকজনকে বাংলাদেশের আদালত যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত করেছেন। এ নিয়ে এর আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক হয়েছে। তবে আমাদের বিলবোর্ডের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জুডিশিয়াল কিলিং’। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, খুন, আয়নাঘর, শাপলা হত্যাকাণ্ড এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটেই বিলবোর্ডটি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ কয়েকজনের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য কাউকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া নয়; বরং তাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল কি না, সেই বিতর্কটি সামনে আনা।
আম্মার আরও বলেন, এ নিয়ে দেশে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ তাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দেখেন, আবার কেউ বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন। বিচার চলাকালে সাক্ষী সুকরঞ্জন বালীর নিখোঁজ হওয়া, স্কাইপ কথোপকথন ফাঁসসহ বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা হয়েছে। সেই কারণেই ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ প্রসঙ্গটি বিলবোর্ডে স্থান পেয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম বলেন, এ বিষয়ে আমরা এখনো অবগত নই। তবে বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।










