ঢাকা | জুলাই ৯, ২০২৬ - ৩:১৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

রাজশাহীতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ২৫ হাজার মাদক মামলা

  • আপডেট: Thursday, July 9, 2026 - 12:52 am

স্টাফ রিপোর্টার: সারাদেশে মাদক সংক্রান্ত মামলার পাহাড় জমলেও একক জেলা হিসেবে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যাচ্ছে রাজশাহীতে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশের মোট ৮০ হাজারের বেশি বিচারাধীন মাদক মামলার মধ্যে কেবল রাজশাহী জেলাতেই ঝুলে আছে ২৫ হাজার ৬৭১টি মামলা।

যেখানে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা মিলিয়ে ৩৯ হাজার এবং ঢাকা মহানগরে ১৮ হাজার মামলা বিচারাধীন, সেখানে একক জেলা হিসেবে রাজশাহীর এই সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অথচ মাঠপর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানে প্রতিনিয়ত নতুন মামলা যুক্ত হলেও, পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির গতি থমকে আছে। ফলে আদালতে মামলার নিষ্পত্তি হয় না এমন এক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বিচার প্রক্রিয়ায়।

সূত্র জানায়, রাজশাহীর বিভিন্ন আদালতে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মামলা আটকে আছে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে, যার সংখ্যা ৯ হাজার ৩৫৫টি। এর পরেই রয়েছে মহানগর দায়রা জজ আদালত, যেখানে মাদকের ৭ হাজার ১৬০টি মামলা ঝুলে আছে।

এছাড়া চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীনে ৬ হাজার ৭৪৯টি এবং জেলা ও দায়রা জজসহ অন্যান্য আদালতে ৩ হাজার ৬০৭টি মাদক মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এর বাইরে রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ কয়েকটি আদালত ও ট্রাইব্যুনালেও বেশকিছু মাদক মামলা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। দীর্ঘ সময় ধরে মামলা চলায় নষ্ট হচ্ছে আদালতের হাজার হাজার কর্মঘণ্টা, অন্যদিকে জামিনে বের হয়ে আসামিরা আবারও জড়াচ্ছে পুরোনো পেশায়।

উদাহরণ হিসেবে, ২০১৮ সালের ১০ জুলাই ১ কেজি ২১০ গ্রাম হেরোইনসহ গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ থেকে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের চরবাগডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম। পূর্বের ৩টি মামলাসহ মোট ৪টি মামলার আসামি নুরুল কয়েক মাস পরেই জামিনে মুক্ত পান। বর্তমানে রাজশাহী বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে আড়াই বছর আগে। কিন্তু ১৪ জন সাক্ষীর মধ্যে বারবার সমন পাঠিয়েও মাত্র ২ জনের সাক্ষ্য নেয়া সম্ভব হয়েছে। বাকিরা আদালতে না আসায় মামলার কার্যক্রম মন্থর হয়ে পড়েছে।

মামলাজটের এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে দায় কার, তা নিয়ে রাজশাহী বারের সাধারণ আইনজীবী এবং রাষ্ট্রপক্ষের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। আইনজীবীরা জানান, ধার্য তারিখে সাক্ষী হাজির করা এবং শুনানি নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আদালতের পিপি ও পুলিশের হলেও অভিযোগ রয়েছে তারা সেভাবে সক্রিয় নন। আবার সমন দেয়ার পরও সাক্ষী আদালতে হাজির হয় না। এখানে বিচারক সংকট মূল কারণ নয় বলেও তারা মনে করেন।

রাজশাহীর পিপি অ্যাডভোকেট রইসুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, এই দায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের নয়, বরং কিছু বাস্তব কারণে মামলার পাহাড় জমেছে। এর অন্যতম কারণগুলো হলো মাদক মামলা তদন্তে পুলিশের দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষী হাজিরে পুলিশের অসহযোগিতা এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বারবার নতুন তারিখের জন্য আবেদন করা, যা আদালত মঞ্জুর করেন। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পুলিশ, রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষ এবং বিচারকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমানভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

মাঠপর্যায়ের চিত্র অনুযায়ী, এপ্রিল ও মে মাসে ডিএনসি রাজশাহী জেলায় ২৬৯টি অভিযান চালিয়ে ১৪২ জনকে গ্রেফতার করে এবং ১৫৪টি মামলা রুজু করে। এর মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১০৩টি মামলার নিষ্পত্তি হয় এবং ৯০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। একই সময়ে জেলা পুলিশ ৪৮৩টি অভিযানে ১২৯ জনকে গ্রেফতার করে ৯৪টি মামলা এবং মহানগর পুলিশ ৭৬৯টি অভিযানে ১৩৬ জনকে গ্রেফতার করে ১২৫টি মামলা রুজু করে। এছাড়া বিজিবি ৩ হাজার ৯০৪টি অভিযানে ৪ জনকে গ্রেফতার ও ৭৯টি মামলা এবং র‌্যাব ২৭৯টি অভিযানে ২৬ জন মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করে।

আইনজীবীদের মতে, এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া এখন সময়ের দাবি। এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ ও প্রচার কমিটির সভাপতি এবং রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, কীভাবে এই বিপুলসংখ্যক মাদক মামলা একটি যৌক্তিক ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা যায়, তা নিয়ে কমিটির আগামী সভায় বিস্তারিত আলোচনা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

সোনালী//জগদীশ রবিদাস