ঢাকা | জুলাই ৯, ২০২৬ - ২:৩৩ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

প্লাস্টিক-স্টিলের দাপটে ধুঁকছে রাজশাহীর বেতপট্টি

  • আপডেট: Thursday, July 9, 2026 - 1:30 am

স্টাফ রিপোর্টার: প্লাস্টিক, স্টিল আর আধুনিক নানামুখী আসবাবপত্রের তীব্র দাপটে রাজশাহী মহানগরীর হোসনিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

স্বাধীনতার পূর্বে সিলেট থেকে আসা একদল দক্ষ কারিগরের হাত ধরে মহানগরীর শেখপাড়া এলাকায় গড়ে উঠেছিল এই ‘বেত পট্টি’। এক সময় কারিগর ও সৌখিন ক্রেতাদের কোলাহলে মুখর থাকা এই এলাকাটি এখন প্রায় নিঃশব্দ। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পটি এক সময় রাজশাহীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য অংশ ছিল, যেখানে বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে বেতের তৈরি আকর্ষণীয় ট্রে, ঝুড়ি বা চেয়ার দেয়াকে এক ধরনের সামাজিক মর্যাদা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে কাঁচামালের সংকট, আধুনিক পণ্যের বাজার দখল আর নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে স্বাধীনতার আগে ১৫ থেকে ২০টি দোকান নিয়ে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্যবাহী বাজারে এখন মাত্র তিনটি দোকান কোনোমতে টিকে রয়েছে।

রাজশাহীর এই বেতশিল্পের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সিলেট শহর থেকে আসা একমাত্র জীবিত কারিগর ফরিদুর রহমানের জীবনসংগ্রাম। মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবা এবং ১৫ বছর বয়সে মাকে হারিয়ে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের হাত ধরে সত্তর বছর আগে কিশোর বয়সে রাজশাহীতে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। এরপর রাজশাহীর মাটিতেই সংসার ও ব্যবসা পেতে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই শুরু করেন। প্রথম দিকে তৎকালীন রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ক্যাডেট কলেজের কিছু কাজ পেয়ে নিজের শ্রম ও সততায় ব্যবসার প্রসার ঘটান। এক সময় তাঁর অধীনে ২০ থেকে ২২ জন কারিগর কাজ করতেন এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক শোরুম ছিল। বর্তমানে শেখপাড়ার সরু গলিতে টিকে থাকা তিনটি দোকানের একটিতে এখনো দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের ছাপ নিয়ে স্মৃতি পাহারা দিচ্ছেন এই প্রবীণ কারিগর। তাঁর দোকানে এখনো ঝুলতে দেখা যায় বাঁশের তৈরি নান্দনিক দোলনা, আরামদায়ক চেয়ার এবং লাল, সবুজ ও কালো রঙের সংমিশ্রণে তৈরি আকর্ষণীয় ডিজাইনের বৈচিত্র্যময় বাঁশের ঝুড়ি।

ফরিদুর রহমান শুধু একজন দক্ষ কারিগরই নন, বরং এই শিল্পের অন্যতম একজন উদ্ভাবক হিসেবেও সমাদৃত। স্বাধীনতার পূর্বে দেশে একবার ভয়াবহ বন্যা দেখা দিলে বেতের তীব্র সংকট তৈরি হয় এবং কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সেই সংকটময় মুহূর্তে একদিন চায়ের দোকানের সামনে ঝুলতে থাকা প্লাস্টিকের সরু ফিতা দেখে তিনি নতুন এক চিন্তা খাটান। তৎকালীন পাকিস্তানের করাচির একটি কোম্পানি থেকে প্লাস্টিকের সুতা এনে তিনি দেশে প্রথমবারের মতো প্লাস্টিকের বোনা আসবাব তৈরি শুরু করেন। শুরুতে অনেকেই এই ভাবনাকে অবাস্তব মনে করে তাঁকে পাগল বললেও পরবর্তী সময়ে তাঁর এই অভিনব পদ্ধতি সফল প্রমাণিত হয় এবং রাজশাহীর অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও তাঁকে অনুসরণ শুরু করেন।

বর্তমানে বয়সের ভারে ফরিদুর রহমান নিজে আর কাজ করতে পারেন না, তবে দোকানে বসে কারিগরদের কাজ তদারকি ও পরামর্শ দেন। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর মনে রয়েছে এক গভীর আক্ষেপ। তাঁর নিজের সন্তানেরা এই কষ্টসাধ্য পেশাকে এগিয়ে নেওয়ার চেয়ে কেবল দোকানের মালিকানা পেতেই বেশি আগ্রহী। ব্যবসার মূল দায়িত্ব ও ভালোবাসা না থাকলে এই শিল্প টিকবে না এমন আশঙ্কা থেকে ফরিদুর রহমান এখনো পুরোপুরি দোকানের দায়িত্ব সন্তানদের হাতে তুলে দেননি। সমসাময়িক অন্য সব ব্যবসায়ী ও কারিগররা চলে গেলেও তিনি মনে করেন তাঁর পর হয়তো এই দোকানের দরজাও একদিন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ একটি শিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন যোগ্য উত্তরসূরি ও ভালোবাসা।

শেখপাড়া ও হোসনিগঞ্জ এলাকার বর্তমান বেতপট্টির অবশিষ্ট ব্যবসায়ীরা মনে করেন, রাজশাহীর এই ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে পুরোপুরি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে এখন বড় ধরনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে এই শিল্পের সাথে জড়িতদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করা, নতুন কারিগরদের আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ নেয়া জরুরি। বিশেষ করে বিভিন্ন জাতীয় হস্তশিল্প মেলা ও প্রদর্শনীতে হোসনিগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী বেত ও বাঁশজাত পণ্যগুলোকে স্থান দেওয়া গেলে নতুন করে ক্রেতাদের আগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব এবং এর মাধ্যমেই কেবল মৃতপ্রায় এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।