ঢাকা | জুন ২৪, ২০২৬ - ২:০৭ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

সাংবাদিকতা পেশায় ঐক্যের গুরুত্ব, তাৎপর্য, সংকট ও করণীয়

  • আপডেট: Tuesday, June 23, 2026 - 11:35 pm

সাংবাদিকতা একটি মহান, দায়িত্বশীল ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট পেশা। সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি, অনিয়ম, বৈষম্য ও জনদুর্ভোগের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন সাংবাদিকরা। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করাই সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণমাধ্যমই সমাজের দর্পণ, আর সাংবাদিকরা সেই দর্পণের রক্ষক। কিন্তু বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা পেশা নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। পেশাগত অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা, কম বেতন, রাজনৈতিক ও করপোরেট চাপ, হামলা-মামলা, বিভাজন এবং সংগঠনগত দুর্বলতা সাংবাদিক সমাজকে ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অনুভূত হচ্ছে। তাই সাংবাদিক সমাজের ঐক্য এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য দাবি।

সাংবাদিকদের ঐক্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: সাংবাদিকদের ঐক্য মানে শুধু কোনো সংগঠনের ব্যানারে একত্র হওয়া নয়; বরং পেশাগত অধিকার, নিরাপত্তা, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সত্য প্রকাশের স্বার্থে সম্মিলিতভাবে কাজ করা। একজন সাংবাদিক যখন নির্যাতন, হয়রানি, হামলা-মামলা কিংবা পেশাগত চাপে পড়েন, তখন অন্য সাংবাদিকদের নৈতিক ও সাংগঠনিক সমর্থন তার সাহস ও মনোবল বাড়িয়ে দেয়। ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে এবং পেশার মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা কিংবা সংবাদ প্রকাশে বাধা সৃষ্টি হলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে অনেক অন্যায়ের প্রতিবাদ সফল হয়েছে। যখন সাংবাদিক সমাজ বিভক্ত থাকে, তখন তাদের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন মহল সেই দুর্বলতার সুযোগ নেয়। পক্ষান্তরে, ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে। ঐক্য সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার আদায়ের অন্যতম প্রধান শক্তি। দেশের বহু গণমাধ্যমকর্মী এখনও কম বেতন, অনিয়মিত ভাতা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং অমানবিক কর্মপরিবেশের মধ্যে কাজ করছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইন ও ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন হয় না। অনেক সাংবাদিক বছরের পর বছর অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা পান না। এসব সমস্যা সমাধানে সাংবাদিকদের সম্মিলিত আন্দোলন ও ঐক্যের বিকল্প নেই।

গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় ঐক্যের ভূমিকা: সাংবাদিকদের ঐক্য শুধু তাদের নিজেদের স্বার্থেই নয়, বরং গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সাংবাদিক সমাজ রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে। সাংবাদিকরা যদি ভয়ভীতি, বিভক্তি বা রাজনৈতিক চাপে দুর্বল হয়ে পড়েন, তবে সত্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতিহাসে দেখা গেছে, যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মানবাধিকার রক্ষা কিংবা সামাজিক পরিবর্তনে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বিভিন্ন গণআন্দোলনে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে হলে প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও ঐক্য।

ডিজিটাল যুগে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা: বর্তমান ডিজিটাল যুগে গণমাধ্যমের পরিসর যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে চ্যালেঞ্জও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার, অনলাইন পোর্টালের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতার কারণে ভুয়া খবর, অপপ্রচার ও তথ্য বিভ্রান্তি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বজায় রাখতে সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, তথ্য যাচাই এবং পেশাগত নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় থাকলে ভুয়া তথ্য মোকাবিলা করা সহজ হয় এবং জনগণের কাছে গণমাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থা বৃদ্ধি পায়।

সাংবাদিকদের ঐক্যের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা: বর্তমান সময়ে সাংবাদিক সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো রাজনৈতিক বিভাজন। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে পেশাগত স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, যা সাংবাদিক সমাজের সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে। ব্যক্তিগত স্বার্থ ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বও বড় সমস্যা। অনেক সময় সংগঠনের নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার লড়াই এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এতে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ সাংবাদিকদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো পেশাগত বৈষম্য। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের সাংবাদিকদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য রয়েছে। রাজধানীর বাইরে মফস্বলে দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকরা প্রায়ই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও পর্যাপ্ত সম্মান, নিরাপত্তা বা আর্থিক সুবিধা পান না। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। এছাড়া মালিকপক্ষের চাপ, করপোরেট স্বার্থ, অনলাইন গণমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, অপসাংবাদিকতা এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের সাংবাদিকতায় প্রবেশও ঐক্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

করণীয় ও সমাধান: সাংবাদিক সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন পেশাগত স্বার্থকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। সাংবাদিকদের বুঝতে হবে পেশার মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকর, দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক হতে হবে। সংগঠনের কার্যক্রম যেন শুধু নির্বাচন বা পদ-পদবির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সাংবাদিকদের অধিকার আদায়, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা ও কল্যাণে বাস্তব ভূমিকা রাখতে হবে।

নবীন ও প্রবীণ সাংবাদিকদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের উচিত নতুন প্রজন্মকে সহযোগিতা করা এবং পেশাগত নৈতিকতা সম্পর্কে সচেতন করা। একইসঙ্গে সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, তথ্য যাচাই পদ্ধতি, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার ও গণমাধ্যম মালিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

সাংবাদিক নেতাদের ভূমিকা: সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাংবাদিক নেতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ গড়ে তুলতে নেতাদের হতে হবে দায়িত্বশীল, দূরদর্শী ও নিরপেক্ষ। সাংবাদিক নেতাদের উচিত ব্যক্তিগত স্বার্থ বা দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকদের ন্যায্য দাবি ও স্বার্থ রক্ষায় সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া। প্রকৃত নেতৃত্ব তখনই সফল হয়, যখন তা বিভক্তি নয় বরং ঐক্য, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে পারে। নেতাদের আরও দায়িত্ব হলো নবীন ও প্রবীণ সাংবাদিকদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা। একইসঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সত্য প্রকাশের অধিকার ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে।

যেকোনো সংকট, হামলা-মামলা কিংবা পেশাগত হয়রানির ঘটনায় সাংবাদিক নেতাদের দ্রুত ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া সাংবাদিক সমাজকে সাহস ও আস্থা জোগায়। সাংবাদিক নেতারা যদি দায়িত্বশীল ও আন্তরিক ভূমিকা পালন করেন, তবে সাংবাদিক সমাজ আরও শক্তিশালী, মর্যাদাবান ও জনমুখী হয়ে উঠবে।সবশেষে বলা যায়, সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষায় সাংবাদিকদের ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। বিভেদ নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও পেশাগত দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে সাংবাদিক সমাজকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। কারণ ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজই পারে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে, জনগণের আস্থা অটুট রাখতে এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে। সময় এখন বিভক্তির নয়, ঐক্যের। সাংবাদিক সমাজ যত বেশি ঐক্যবদ্ধ হবে, তত বেশি শক্তিশালী হবে গণমাধ্যম, সুদৃঢ় হবে গণতন্ত্র এবং নিরাপদ হবে সত্য প্রকাশের পথ।

লেখক: মুহা: আব্দুল আউয়াল, সভাপতি, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন (আরইউজে)। e-mail: awal.raj.diganta@gmail.com