ঢাকা | জুন ২৪, ২০২৬ - ১২:৪৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

রাজশাহীতে এইচআইভি সংক্রমণ: ৬৬ শতাংশ রোগীই সমকামী

  • আপডেট: Tuesday, June 23, 2026 - 11:31 pm

স্টাফ রিপোর্টার: ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজশাহীতে মোট ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯২ জনই সমকামী, যা মোট আক্রান্তের ৬৬.১৮ শতাংশ। একই সময়ে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯৪ জনে।

তবে আক্রান্তের শীর্ষে রয়েছে সিরাজগঞ্জ। এ জেলা সর্বোচ্চ ৩১০ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয় এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, সচেতনতার ঘাটতি, সামাজিক সংকোচ ও গোপন নেটওয়ার্ক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা। নগরীর বিভিন্ন স্থানে সমকামীদের নিয়মিত জমায়েত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা গোপন নেটওয়ার্ক পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।

বিভাগের জেলাভিত্তিক তথ্য বলছে, সিরাজগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩১০ জন, রাজশাহীতে ১৩১ জন, বগুড়ায় ১০৯ জন, পাবনায় ৭৮ জন, নওগাঁয় ৬৫ জন, নাটোরে ৪৩ জন, জয়পুরহাটে ৩৭ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২১ জন আক্রান্ত রয়েছেন।

রামেক হাসপাতালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১২ হাজার ৮৫২ জনের পরীক্ষায় ১১৫ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে পুরুষ ১০৫ জন, নারী ৯ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ১ জন। বৈবাহিক অবস্থায় বিবাহিত ৪৮ জন ও অবিবাহিত ৬৭ জন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে ১৫-২৪ বছর বয়সী ৩৫ জন ও ২৫-৫০ বছর বয়সী ৮০ জন আক্রান্ত। প্রবাসফেরত আক্রান্তের সংখ্যা ৪ জন।

পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা দ্রুত সচেতনতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীতে নিয়মিত স্ক্রিনিং ও পরামর্শ সেবা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মোট ১২ হাজার ৮৫২ জন পরীক্ষা করিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১০৫ জন, নারী ৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর একজন। বৈবাহিক অবস্থার হিসেবে আক্রান্তদের মধ্যে বিবাহিত ৪৮ জন এবং অবিবাহিত ৬৭ জন। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী আক্রান্ত রয়েছেন ৩৫ জন এবং ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৮০ জন। এছাড়া প্রবাসফেরত আক্রান্তের সংখ্যা চারজন।

ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শনাক্তদের মধ্যে সমকামী ৫৮ জন, যৌনকর্মীর সংস্পর্শে এসেছেন এমন ব্যক্তি ৩৫ জন, যক্ষ্মা রোগী দুজন, যৌনকর্মী একজন, তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর দুজন এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর ১৪ জন রয়েছেন।

অন্যদিকে সিভিল সার্জন কার্যালয় হাসপাতালের তথ্যের বাইরে শনাক্ত হওয়া আরও ৩৪ জন রোগীর তথ্য দিয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই সমকামী। এদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ এবং তিনজন তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর সদস্য। বৈবাহিক অবস্থার বিবেচনায় ২৫ জন বিবাহিত এবং ছয়জন অবিবাহিত। বয়সভিত্তিক হিসেবে ২৫ বছরের কম বয়সী ৯ জন এবং ২৫ বছরের বেশি বয়সী ২৫ জন রয়েছেন।

দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্য একত্র করলে দেখা যায়, রাজশাহীতে শনাক্ত হওয়া মোট ১৩৯ জন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ৯২ জনই সমকামী। স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই সংখ্যা স্থানীয় পর্যায়ে সংক্রমণের ধরন বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বিভাগের আট জেলায় এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা ৭৯৪ জন। এর মধ্যে বগুড়ায় ১০৯ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২১ জন, জয়পুরহাটে ৩৭ জন, নওগাঁয় ৬৫ জন, নাটোরে ৪৩ জন, পাবনায় ৭৮ জন, রাজশাহীতে ১৩১ জন এবং সর্বোচ্চ ৩১০ জন আক্রান্ত রয়েছেন সিরাজগঞ্জ জেলায়। বিভাগজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির এই প্রবণতা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদেরও ভাবিয়ে তুলেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর কয়েকটি নির্জন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকায় রাতে সমকামীদের নিয়মিত জমায়েত হয়। নগরীর সি অ্যান্ড বি মোড় (শিমলা), কোর্ট স্টেশন, ডিঙাডোবা, ফুলতলাসহ পদ্মাপাড়ের বিভিন্ন স্থানের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই এসব এলাকায় গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের গোপন কার্যক্রম চলে। যদিও এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো অভিযান বা কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু অফলাইন নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গড়ে উঠেছে বিভিন্ন গ্রুপ ও নেটওয়ার্ক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সদস্য সংগ্রহ, যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই যোগাযোগব্যবস্থা সংক্রমণ শনাক্ত ও প্রতিরোধ কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সমকামিতা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর নৈতিক অবক্ষয় ও মানবস্বভাববিরোধী আচরণ। এটি শুধু ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থি নয়, সামাজিকভাবেও পরিবারব্যবস্থা ও নৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। পাশাপাশি অনিরাপদ যৌন আচরণ এইডসসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ধর্মীয় অনুশাসন, নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা ও স্বাস্থ্যসচেতনতার সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন।

এইচআইভি আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোস’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা গণমাধ্যমকে বলেন, এইচআইভি আক্রান্তদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি অংশ এখনো নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। এতে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। এইচআইভি আক্রান্ত মানেই যে যৌন সংক্রমণ, তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন উপায়ে একজন ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন। এক্ষেত্রে সরকার বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে, কিন্তু সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়াতে হবে।

গত কয়েক বছরে দেশে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন) ডা. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, পুরুষ সমকামীদের মধ্যে, বিশেষ করে রিসিভটিভ পার্টনারদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এতে পায়ুপথে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তিনি বলেন, এইচআইভি শুধু যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে নয়; পরীক্ষা ছাড়াই রক্ত গ্রহণ, একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার, মাদক গ্রহণে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ভাগাভাগি এবং মা থেকে শিশুর শরীরেও সংক্রমিত হতে পারে।

এদিকে রামেক হাসপাতালে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার চালু হলেও অনেক রোগী এখনো চিকিৎসা সেবা নিতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আক্রান্তদের অভিযোগ, গত বছরের ডিসেম্বরে রাজশাহীতে এআরটি সেন্টার চালু হলেও ডিসেম্বরের আগে শনাক্ত হওয়া অনেক রোগীর ফাইল এখনো বগুড়ার শহিদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে রয়েছে। ফলে নিয়মিত ওষুধ সংগ্রহ ও ফলোআপ চিকিৎসার জন্য তাদের বগুড়ায় যেতে হচ্ছে।

রামেক হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সেলিং সেন্টারের মুখপাত্র ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ গণমাধ্যমকে বলেন, যৌন আচরণজনিত কারণে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে সমকামীদের মধ্যে শনাক্তের হার বেশি। একই সঙ্গে যৌনপল্লিতে যাতায়াতকারীদের মধ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক। তবে আক্রান্তদের শনাক্ত হওয়া ইতিবাচক বিষয়। কারণ এতে তারা চিকিৎসার আওতায় আসেন এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমে।

তিনি বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে রাজশাহীতে এআরটি সেন্টার চালু হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসা, ওষুধ ও কাউন্সেলিং সেবায় কোনো সঙ্কট নেই। তবে পুরোনো রোগীদের ফাইল স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় কিছু সময় লাগছে। এরইমধ্যে কয়েকজন রোগীর ফাইল স্থানান্তর করা হয়েছে। খুব শিগগির বাকি রোগীদেরও রাজশাহী থেকেই সেবা দেয়া সম্ভব হবে।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস