ঢাকা | অগাস্ট ১৯, ২০২৬ - ১১:১৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম

গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের পৈতৃক ভিটায় হাসপাতাল স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি স্থানীয়দের

  • আপডেট: Wednesday, August 19, 2026 - 10:43 pm

কলিট তালুকদার, পাবনা থেকে: ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ অথবা এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন’, ‘কাছে যাবো কবে পাবো ওগো তোমার নিমন্ত্রণ’ এমন বহু জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা পাবনার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামের কৃতী সন্তান গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। তাঁর লেখা বহু গান বাঙালির আবেগ, স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে।

২০ আগস্ট গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর পাবনার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই প্রখ্যাত গীতিকার। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে তিনি কলকাতায় চলে যান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে একবার বাংলাদেশে এসে শেষবারের মতো ঘুরে যান তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত পৈতৃক ভিটায়। ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট কলকাতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গোপালনগর গ্রামের পূর্বপুরুষের বাড়িতে। পড়াশোনার জন্য পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতায় চলে যান। একসময় নিয়মিত গ্রামের বাড়িতে আসা-যাওয়া থাকলেও দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে স্থায়ীভাবে ওপার বাংলায় চলে যান তিনি। পরিবার ভারতে চলে যাওয়ার সময় গোপালনগরে মজুমদার পরিবারের ছিল বিশাল উঠোনসহ তিনতলা বাড়ি। আশির দশকেও সেই বাড়ির কিছু স্মৃতিচিহ্ন ছিল। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেসবের কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই।

সরেজমিনে গোপালনগরে গিয়ে দেখা যায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের পৈতৃক বাড়ির জায়গায় এখন ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ওই জায়গায় তাঁর স্মৃতিচিহ্ন বলতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি তালগাছ ও একটি পুকুর ছাড়া আর কিছু নেই।

ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৪-৭৫ সালে গোপালনগর মৌজায় মজুমদার বংশের প্রায় ৩৩ একর জমি সরকার অধিগ্রহণ করে। সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় হাসপাতাল। বর্তমানে ওই স্থানে ৫০ শয্যার হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে।

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ভাতিজা গৌরঙ্গ মজুমদার বলেন, ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সফরে এসে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার শেষবারের মতো তাঁর পৈতৃক ভিটায় যান। জন্মভূমির সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। স্থানীয় শিক্ষক মেহেদী বলেন, “গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এলাকার মানুষ হিসেবে আমরা গর্বিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তাঁর কোনো স্মৃতিই আমরা ধরে রাখতে পারিনি। তাঁর পৈতৃক বাড়ির জায়গায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হলেও সেখানে তাঁর নামে একটি স্মৃতিফলকও নেই।

স্থানীয়রা জানান, হাসপাতালের পেছনে এখনো বেশ কিছু জায়গা পড়ে আছে। সেখানে সরকার উদ্যোগ নিলে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের নামে একটি পাঠাগার, সংগ্রহশালা ও স্মৃতি কমপ্লেক্স গড়ে তোলা সম্ভব। এতে নতুন প্রজন্ম তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে। পাবনার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবুল কাশেম বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গানের রচয়িতা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার আমাদের পাবনার সন্তান। এটি যেমন আমাদের গর্বের বিষয়, তেমনি এই কালজয়ী গীতিকবির অবদান তুলে ধরতে পাবনায় কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকাটা দুঃখজনক ও লজ্জার।

ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ রাশেদুল হাসান শাওন বলেন, “গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের স্মৃতিবিজড়িত জায়গায় বর্তমানে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হচ্ছে এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।”

ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ইমামা বানিন বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রখ্যাত এই গীতিকবির স্মৃতি ধরে রাখতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ নয়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের জন্মভূমিতে তাঁর নামে স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁর পৈতৃক ভিটায় একটি স্মৃতিফলক, পাঠাগার ও সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হবে বাঙালির এই কালজয়ী গীতিকারের স্মৃতি।