চীনের বাজারে রাজশাহীর রেশমের বিপুল সম্ভাবনা
গৌরব ফেরাতে যুগান্তকারী উদ্যোগ:
স্টাফ রিপোর্টার: একসময় রাজশাহীর রেশম ছিল আভিজাত্য, সৌন্দর্য ও বাঙালি ঐতিহ্যের অনন্য প্রতীক। নানা প্রতিকূলতায় ম্লান হতে বসা সেই গৌরবময় অতীত আবারও ফিরে পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীন ও বাংলাদেশের যৌথ গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৌশলগত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর ভর করে আবারও বিশ্বমঞ্চে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে ‘রাজশাহী সিল্ক’। এ বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে রাজশাহী মহানগরীতে চীন ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে রেশম চাষ, গবেষণা ও উন্নয়ন বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে বাংলাদেশ রেশম চাষ উন্নয়ন বোর্ড। সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম এমপি বিশাল চীনা বাজারে বাংলাদেশি রেশম রপ্তানির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী রেশম শিল্পকে আধুনিকায়ন করা এবং এর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সরকার মাঠপর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েছে। রাজশাহীর রেশম কেবল একটি শিল্প নয়; এটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও অহংকার। আধুনিক প্রযুক্তি, উচ্চতর গবেষণা ও নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে কাজ করছে সরকার।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কারখানাগুলো চালুর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের পরিধি বাড়ানো, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রাজশাহীর রেশম শিল্পের প্রচারণায় আধুনিক ‘মার্কেটিং পলিসি’ চালুর কাজ চলছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে ‘রাজশাহী সিল্ক বোর্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান সরকার গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে রেশম শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার লক্ষ্য নিয়েছে।
রাজশাহীর রেশম কারখানার সাম্প্রতিক উৎপাদনের চিত্রও বেশ আশাব্যঞ্জক। ২০১৮ সালে পুনরায় চালুর পর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কারখানাটিতে মোট ৫৯ হাজার ৪৬৮ মিটার রেশম কাপড় উৎপাদিত হয়েছে। বর্তমানে কারখানার নিজস্ব শোরুমে ঐতিহ্যবাহী গরদ শাড়ি, আকর্ষণীয় প্রিন্টেড শাড়ি, মার্জিত পাঞ্জাবির কাপড় ও বলাকা সিল্কসহ উচ্চমানের রেশম পণ্য সরাসরি বিক্রি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশাল চীনা বাজারে বাংলাদেশি রেশমের শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হলে এর প্রত্যক্ষ সুফল পাবেন রাজশাহীর প্রান্তিক রেশম চাষি, তাঁতি ও উদীয়মান উদ্যোক্তারা। মানসম্মত সুতা ও কাপড়ের পাশাপাশি আধুনিক নকশা, প্রিমিয়াম প্যাকেজিং ও ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং জোরদার করা গেলে ‘রাজশাহী সিল্ক’ বিশ্ববাজারে একটি প্রভাবশালী ব্র্যান্ড হিসেবে জায়গা করে নেবে। চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত এ সম্মেলনটি স্থানীয় ঐতিহ্যকে বিশ্বমানের বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, চীনের ঝেজিয়াং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ও ভাইস ডিন অধ্যাপক জু কিউজি এবং চীন-বাংলাদেশ রেশম গবেষণা কেন্দ্রের প্রকল্প উদ্যোক্তা ও প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক নুসরাত জাহান নিপা। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক তৌফিক আল মাহমুদ।
এছাড়ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম মঞ্জুর হোসেন, বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী, বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক (অর্থ ও পরিকল্পনা) ড. এম, এ মান্নান, পরিচালক (গবেষণা ও প্রশিক্ষণ) নাছিমা খাতুন, পরিচালক (প্রশাসন) মু: রেজা হাসান, পরিচালক (উৎপাদন ও বিপণন) মিজানূর রহমান, ব্যবসায়ীবৃন্দ, রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের গবেষকবৃন্দ, রেশম উদ্যোক্তাগণসহ বোর্ডের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম এমপি বাংলাদেশ রেশম কারখানা এবং রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











