ঢাকা | জুলাই ১৯, ২০২৬ - ১১:৩৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম

আগামী বছরই ২০ কোটি লিটার সুপেয় পানি পাবে রাজশাহী নগরবাসী

  • আপডেট: Saturday, July 18, 2026 - 11:00 am

দৃশ্যমান ৪ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট:

জগদীশ রবিদাস: ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ আর দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সুপেয় পানির তীব্র সংকটের মুখোমুখি বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র রাজশাহী। বর্তমানে কেবল রাজশাহী নগরীতেই সুপেয় পানির দৈনিক ঘাটতি থাকছে প্রায় পৌনে চার কোটি লিটার। বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতিনিয়ত নেমে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর চাপ কমিয়ে নগরবাসীকে টেকসই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাস্তবায়িত হচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ‘ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার প্রকল্প’।

বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ৪ হাজার ৬২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই মেগা প্রকল্পটির ভৌত কাজ এরই মধ্যে ৬৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটির সার্বিক কাজ শেষ হলে পদ্মা নদী থেকে পানি এনে শোধনের মাধ্যমে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা ২০৩৫ সালের সম্ভাব্য পানির চাহিদাও অনায়াসে মেটাতে সক্ষম।

বর্তমানে রাজশাহী মেট্রোপলিটন এলাকায় দৈনিক পানির মোট চাহিদা রয়েছে প্রায় ১১ কোটি ৩২ লাখ লিটার। এই চাহিদা মেটাতে ওয়াসা মূলত গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে দিনে ৮ কোটি ৬৫ লাখ লিটার পানি তোলে, আর ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে শোধন করা হয় মাত্র ৯০ লাখ লিটার। ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ ভূগর্ভস্থ পরিবেশ রক্ষায় নদীর পানি শোধনের কোনো বিকল্প ছিল না। এই বাস্তবতায় ২০১৮ সালের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায় প্রকল্পটি। পরবর্তীতে ২০২১ সালের মার্চে চীনের হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হয়। নানা জরিপ ও পর্যালোচনা শেষে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে গোদাগাড়ী উপজেলার জোত-গোসাইদাস এলাকায় মূল কাঠামোর কাজ শুরু হয়।

বিশাল এই কর্মযজ্ঞ মূলত তিনটি প্রধান ধাপে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথমত, গোদাগাড়ীর পদ্মা ও মহানন্দা নদীর মোহনায় মূল পানির যোগান নিশ্চিত করতে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ইনটেক পয়েন্ট, যেখানে সমীক্ষা অনুযায়ী সারা বছরই অন্তত ৩০ ফুট গভীরতায় পানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ থাকবে। দ্বিতীয়ত, ইনটেক পয়েন্টের পাশেই গড়ে উঠছে দৈনিক ২০ কোটি লিটার শোধন ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় প্ল্যান্ট। আর তৃতীয় ধাপে, পবা উপজেলার হরিপুরে বসানো হচ্ছে বুস্টার পাম্প প্রকল্প ও বিদ্যুৎ সাবস্টেশন। মূল প্ল্যান্ট থেকে হরিপুর হয়ে নগরী পর্যন্ত সাড়ে ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রান্সমিশন পাইপলাইনের মধ্যে ইতোমধ্যে ২১ কিলোমিটারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে গোদাগাড়ী-রাজশাহী মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকায় চলছে দ্রুত পাইপলাইন স্থাপনের কাজ।

পাশাপাশি নগরীতে ১৬ কিলোমিটার ডিস্ট্রিবিউশন লাইন স্থাপন করা হয়েছে এবং আরও ১০ কিলোমিটারের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রকল্পে ফ্রান্সের বিশ্বখ্যাত পানি শোধন প্রযুক্তি এবং চীনের উন্নতমানের জিংজিয়ান কোম্পানির দীর্ঘস্থায়ী পাইপলাইন ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অন্তত ৭০ বছরের আয়ুষ্কাল বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নির্বাচন করা হয়েছে। প্রকল্পের কর্মস্থলে প্রতিদিন দিনরাত এক করে কাজ করে যাচ্ছেন প্রায় দুই হাজার দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী ও শ্রমিক। প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ কারিগরি লোকবল ও শ্রমিক স্থানীয় হওয়ায় তা ওই অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

সার্বিক কাজের অগ্রগতি নিয়ে রাজশাহী ওয়াসার সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহিম সন্তোষ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান, বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও কারিগরি দলের উপস্থিতিতে কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে এবং সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ইতোমধ্যে ৬৫ শতাংশ অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী পারভেজ মামুদ জানান, আগামী ২০৩৫ সালের সম্ভাব্য নাগরিক চাহিদা ও নগর সীমানার প্রসারের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েই এই প্ল্যান্ট ডিজাইন করা হয়েছে এবং সাড়ে ২৬ কিলোমিটারের মধ্যে ২১ কিলোমিটার পাইপলাইন সম্পন্ন হওয়া এক বিশাল সাফল্য।

চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলী সানচিং গণমাধ্যমকে জানান, মাটি ভরাট ও লেভেলিংয়ের পর মূল সাইটের স্ট্রাকচারাল পাইলিং ও সাবস্টেশন তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে কাজ শেষ করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চার হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে দিচ্ছে ১,৭৪৮ কোটি টাকা, আর বাকি ২,৩১৩ কোটি টাকা সহজ সুদে অর্থায়ন করছে চীনের হুনান কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ। অতি সম্প্রতি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়ান আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, মেগা প্রকল্পটি রাজশাহীর সুপেয় পানির সংকট নিরসনের পাশাপাশি অঞ্চলের আর্থসামাজিক চিত্র বদলে দেবে।

মেগা এই প্রকল্পটিকে রাজশাহীর পরিবেশগত সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াকিল গণমাধ্যমকে বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নামছে, তাই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর শতভাগ নির্ভরতা পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক। পদ্মার পানি শোধন করে শহরে আনার এই কর্মযজ্ঞ রাজশাহীর জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। নাগরিক সংগঠন সুজনের রাজশাহী জেলা সভাপতি সফিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার প্রয়োজন। অপরদিকে এসিডি-র উন্নয়ন বিশ্লেষক সুব্রত কুমার পাল মন্তব্য করেন, সরাসরি সুফল দৃশ্যমান হতে শুরু করলে নাগরিকরা দারুণ উপকৃত হবেন এবং একই সাথে এই অঞ্চলে আরও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা জরুরি।

এদিকে, যদিও প্রকল্পের প্রাথমিক মেয়াদ ধরা হয়েছিল চার বছর, তবে বর্তমান কাজের গতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ২০২৭ সালের মধ্যেই পানি শোধনাগারের শতভাগ নির্মাণ শেষ করে নগরবাসীর কাছে পাইপলাইনের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।