ঢাকা | জুলাই ১১, ২০২৬ - ২:১৬ পূর্বাহ্ন

রাজশাহীতে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ, বুকভরা আশা কৃষকের

  • আপডেট: Friday, July 10, 2026 - 10:46 pm

স্টাফ রিপোর্টার: পরিবেশবান্ধব পণ্যের বিশ্বব্যাপী কদর বৃদ্ধি, প্লাস্টিক বর্জ্যের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ এবং বাজারে ভালো দামের জোড়া পালে ভর করে রাজশাহীতে পাটের সুদিন ফিরছে। একসময়ের প্রধান অর্থকরী ফসল ‘সোনালী আঁশ’ নিয়ে পদ্মাপাড়ের চাষিদের মাঝে এবার নতুন উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। অনুকূল প্রকৃতি আর ভালো লভ্যাংশের আশায় চলতি মৌসুমে জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা আঞ্চলিক কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি আবাদি মৌসুমে জেলাজুড়ে মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত মৌসুমে আবাদের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার ১ হাজার ৯৪ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। আবাদ বাড়ার পাশাপাশি এবার উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যও নেয়া হয়েছে।

চলতি বছর জেলায় পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন, যা বিগত বছরের চেয়ে ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি। অন্যদিকে, পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক নাদিম আক্তার জানিয়েছেন, মাঠের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় চলতি বছরে পুরো জেলায় প্রায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এই উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি।

গত ৬ জুলাই সকালে জেলার ঐতিহ্যবাহী নওহাটা পাটের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নতুন ও আগাম জাতের পাট প্রতি মণ ৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে কেনাবেচা হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই বাজারের এই চড়া ভাব বজায় থাকলে যারা আগাম জাতের পাট বুনেছেন, তারা দারুণ লাভবান হবেন বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি বিভাগের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, সাধারণত চৈত্র ও বৈশাখ মাসে পাটের বীজ বপন করা হয়। এরপর শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে চলে পাট কাটা এবং তা পানিতে জাগ দেয়ার কর্মযজ্ঞ। জেলার কৃষকেরা জানিয়েছেন, আর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই তারা মাঠ থেকে পুরোদমে আগাম জাতের পাট কাটা শুরু করতে পারবেন।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এবার পাটের বীজ বপনের পর থেকে আবহাওয়া বেশ অনুকূলে ছিল। পরিমিত বৃষ্টিপাত, মাটির প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা রক্ষা এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের উন্নত মানের বীজ সরবরাহ করার কারণে পাটের গাছগুলো বেশ পুষ্ট ও দীর্ঘ হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ে পবা উপজেলার চাষি রবিউল ইসলাম জানান, তিনি এবার চার বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট লাগিয়েছেন। গাছের বৃদ্ধি খুব ভালো হয়েছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, যদি সময়মতো পাট জাগ দেওয়ার জলাশয় নিশ্চিত করা যায়, শ্রমিক সংকট দূর করা এবং সরকারিভাবে ন্যায্যমূল্য তদারকি করা হয়- তবে আগামীতে পাটের আবাদ আরও বাড়বে।

একই কথা শোনা গেল বাগমারা উপজেলার চাষি সাইদুর রহমানের কণ্ঠে। পাঁচ বিঘা জমিতে পাট বোনা এই চাষি জানান, প্রাকৃতিক কারণে এবার গাছের চেহারা চমৎকার। তবে চাষ ধরে রাখতে পর্যাপ্ত সেচ বা পানির সুবিধা ও বাজারজাতকরণে সরকারি তদারকি বাড়ানো দরকার। চারঘাট উপজেলার কৃষক হৃদয়ও এবার তিন বিঘা জমিতে পাট চাষ করে গত বছরের চেয়ে ভালো ফলনের আশা করছেন। তাদের সবারই মূল চাওয়া- বাজারে যেন পাটের এই ভালো দামটি ধরে রাখা যায়।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেন, উন্নত মানের বীজ ব্যবহার, অনুকূল আবহাওয়া এবং চাষিদের বাড়তি আগ্রহের কারণেই এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ানো আবাদ সম্ভব হয়েছে। পাট কেবল মাঠের ফসল বা অর্থকরী পণ্য নয়, এটি আমাদের পরিবেশবান্ধব কৃষি অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাজারে পাটের যে সুবাতাস বইছে তাকে স্থায়ী রূপ দিতে হলে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, চাষিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, মানসম্মত বীজ সরবরাহ বৃদ্ধি ও সহজ বাজার ব্যবস্থার পাশাপাশি পাটভিত্তিক নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। আর তা করা গেলে সোনালী আঁশ আবারও বরেন্দ্র অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি হয়ে উঠবে।