ঢাকা | জুলাই ৩, ২০২৬ - ১:৫৬ পূর্বাহ্ন

হোয়াটসঅ্যাপে ‘হাইকোয়ালিটি’ জাল নোটের অফার

  • আপডেট: Thursday, July 2, 2026 - 10:32 pm

পেছনে আছে শুধুই প্রতারণা:

মাইনুল হাসান জনি: বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার করে এক শ্রেণির অপরাধী তৈরি করছে নতুন নতুন ফাঁদ।

সম্প্রতি রাজশাহীতে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সরাসরি জাল টাকা বিক্রির একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘ডেলিভারি চার্জসহ জাল টাকা পাওয়া যায়’, এমন বিজ্ঞাপন এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে, যা স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এরইমধ্য তারা অপরাধীদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছে। খুব শীঘ্রই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। অনলাইনে জাল নোট বিক্রির নামে কোনো চক্র প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজশাহী কেন্দ্রিক ফেসবুক পেজ ‘রাজশাহীর নতুন পুরাতন জিনিস ক্রয় বিক্রয়’ এ একটি চক্র অত্যন্ত কৌশলে জাল টাকা বিক্রির প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ওই ফেসুবক পেজের সদস্য ‘নিল আকাশের মাঝে নিল’ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে ওই পোস্ট করা হয়। সেখানে ‘উচ্চমানের নকল নোট’, ‘অর্ডারের জন্য হোয়াটসঅ্যাপে নক দিন’ এমন সব চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করছেন। একই ধরনের বিজ্ঞাপন ‘গউ ঘধযরফ অযধসবফ’ নামের আরেকটি ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা হয়েছে। সেখানেও হাইকুয়ালিয়াটির জাল নোট উল্লেখ করে ০১৮৩৫৯৭৫৩৮০ মোবাইল দিয়ে অর্ডার দিতে বলা হয়েছে। বিজ্ঞাপনে ৫০, ২০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের ছবি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, নোটগুলি কেউ হাতে নিলেও বুঝতে পারবে না যে সেটি জাল।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, সম্প্রতি এ চক্রের সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা জাল টাকা বিক্রির জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। এই চক্রগুলো জাল টাকা তৈরি করে নির্দিষ্ট কয়েকজন সদস্য দিয়ে আসল টাকার ভেতর জাল টাকা মিশিয়ে মানুষকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. মোহা. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, জাল টাকা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভোক্তাদের মাঝে নোট টাকা ব্যবহারের অনাগ্রহ তৈরি করে। তাছাড়া উদ্যোক্তা বা নিম্নআয়ের মানুষের মাঝে জাল টাকা ছড়িয়ে গেলে তারা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, জাল টাকা যেন অনলাইন, অফলাইনে বা অন্য কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ করে ছড়িয়ে না দিতে পারে সেজন্য মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই। অবশ্যই জাল টাকা ছড়ানো রোধ করতে হবে নতুবা বড় ধরণের অর্থনৈতিক বিভ্রান্ত দেখা দিতে পারে।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, পুলিশের সাইবার ইউনিট বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে তাদের ধারণা এটি একটি প্রতারক চক্র। তারা জাল নোট দেয়ার নামে অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেয়ার কৌশল নিয়েছে। তিনি বলেন, রাজশাহী মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট জাল নোট বিক্রির পোস্টদাতার ফেসবুক পেজ পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হয়েছে চক্রটি সিলেট বিভাগের। তাই সাধারণ মানুষকে এসব চক্রের ফাঁদে পা না দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে হবে না। আমাদের নাগরিক হিসেবেও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, কোনো ফেসবুক পেজে জাল টাকা বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখলে সঙ্গে সঙ্গে সেটি রিপোর্ট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আবেগের বশবর্তী হয়ে বা রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আশায় এই ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, জাল টাকা রাখা বা লেনদেন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশে বিশেষ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী জাল মুদ্রা তৈরি, বহন বা লেনদেনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

রাজশাহীর মতো একটি শান্ত ও ঐতিহ্যবাহী শহরে জাল টাকার মতো ঘৃণ্য অপরাধ ছড়ানো কোনোভাবেই কাম্য নয়। ফেসবুকের এই অন্ধকার গলিতে যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাচ্ছে, তাদের নির্মূল করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, প্রযুক্তিবিদ এবং সাধারণ ও সচেতন নাগরিক সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।