ঢাকা | জুন ২৬, ২০২৬ - ৩:৪২ পূর্বাহ্ন

উজান থেকে নামছে ঢল: পদ্মা-যমুনা-সুরমায় ভাঙন, বিলীন হচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ

  • আপডেট: Thursday, June 25, 2026 - 11:11 pm

সোনালী ডেস্ক: উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের কারণে দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজশাহী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রাজবাড়ী এবং সুনামগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দেখা দিয়েছে তীব্র নদীভাঙন। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে শত শত বসতভিটা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।

ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও বিশেষ টিউব ফেললেও পানির প্রবল স্রোত ও ঘূর্ণাবর্তের কারণে অনেক স্থানেই তা টিকছে না। ভিটেমাটি ও জীবিকা হারিয়ে নদীপাড়ের হাজারো মানুষ এখন চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।

বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। উপজেলার ভান্ডারবাড়ী ইউনিয়নের শহরাবাড়ি ও বানিয়াজান স্পারের মধ্যবর্তী কয়েকটি স্থানে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত তিন দিনে প্রায় ১৫০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে, যার মধ্যে গত মঙ্গলবার এক সকালেই বিলীন হয়েছে পাউবোর ফেলা জিও ব্যাগসহ প্রায় ৫৫ মিটার এলাকা। ভাঙন এখন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও মূল লোকালয়ের দিকে ধেয়ে আসছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় পানির প্রবল স্রোতে এই ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের নির্দেশনায় পাউবো বিশেষ নৌকার সাহায্যে ৬ বর্গমিটার সাইজের টিউব বস্তায় বালু ভরে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। বগুড়া পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মালেক জানান, এই বিশেষ টিউব অত্যন্ত কার্যকর এবং ক্ষতি রোধে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা এখন সাময়িক ব্যবস্থার বদলে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

সিরাজগঞ্জ ও কাজিপুর প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি কাজীপুর পয়েন্টে ৬০ সেন্টিমিটার ও সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্টে ৫৪ সেন্টিমিটার বেড়েছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও অরক্ষিত চরাঞ্চলে ভাঙন তীব্র হয়েছে। চরের আখ, পাট ও বাদামের ক্ষেতসহ বহু বসতভিটা নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। এদিকে চৌহালী উপজেলার চর সলিমাবাদ কুয়েত মসজিদ এলাকায় তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে মসজিদের কাছাকাছি প্রায় ৩০-৪০ মিটার তীরবর্তী এলাকা ধসে গেছে। ভাঙন দেখে আশপাশের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি সরিয়ে নিলেও কংক্রিটের তৈরি মসজিদটি এখন নদীর তীরে কোনোমতে টিকে আছে।

পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মওদুদ আহমেদ সবুজ জানান, উজানের পানির তীব্র চাপের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, মসজিদ রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হবে। এছাড়া সদর উপজেলার বাহুকা পয়েন্টেও তীর সংরক্ষণ বাঁধের ৩০ মিটার ধসে গেছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেসুর রহমান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাউবো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

গোয়ালন্দে পদ্মার ভয়াবহ রূপ:

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মা নদীতে পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে গত দুই সপ্তাহ ধরে দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের অন্তত চারটি গ্রামে-উত্তর চর দৌলতদিয়া, মুন্সীবাজার, কাওয়ালজানি ও দেবগ্রামে তীব্র ভাঙন চলছে। শত শত বিঘা ফসলি জমি ও কয়েকশ ঘরবাড়ি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এলাকার একমাত্র চলাচলের কাঁচা সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে স্থানীয়রা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে। রাজবাড়ী পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুব্রত কুমার জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে এবং ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাথী দাস জানান, জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে এমন স্থানগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

২০ বছর ধরে চলছে সুরমার তাণ্ডব:

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় সুরমা নদীর তীব্র ভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তিন গ্রামের শত শত মানুষ। গত কয়েকদিনে গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গ্রামের স্কুল ও মসজিদ অনেক আগেই নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে, এখন অসংখ্য পরিবার বাড়িঘর হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মছাব্বির বলেন, গত ২০ বছর ধরে এই এলাকায় সুরমার ভাঙন চললেও স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কয়ছর এম আহমেদ জানান, তিনি দ্রুত এলাকা পরিদর্শন করবেন এবং পাউবোকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক জানান, জরুরি ব্যবস্থার পাশাপাশি পরবর্তীতে এখানে স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।