ঢাকা | জুন ১৩, ২০২৬ - ৯:৪৭ অপরাহ্ন

শিরোনাম

পদ্মার চরে নৃশংসতা: এখনও নিখোঁজ গুলিবিদ্ধ স্বপন, মরদেহের জন্য আকুতি বাবার

  • আপডেট: Wednesday, June 10, 2026 - 10:35 pm

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মার চরে নিজ বাড়ির সামনে থেকে স্বপন বেপারী (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে মাথায় গুলি করে তুলে নিয়ে যাওয়ার ২৩ দিন পেরিয়ে গেলেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অপহৃত স্বপনকে জীবিত পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছে তার পরিবার।

বৃদ্ধ বাবা সিদ্দিক বেপারীর বুকফাটা দাবি-‘আমার ছেলে আর বেঁচে নেই, তাকে হত্যা করা হয়েছে।’ এখন অন্তত ছেলের শেষ স্মৃতি হিসেবে একটি মরদেহের জন্য প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে আকুল আকুতি জানাচ্ছেন এই অসহায় পিতা।

গত ১৮ মে দিবাগত রাতে বাঘা উপজেলার দুর্গম চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাসখালি চরে এই নৃশংস ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর ২০ মে বাঘা থানায় অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হলেও, দীর্ঘ ২৩ দিনেও পুলিশি তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় চরম ক্ষোভ ও হতাশায় দিন কাটছে ভুক্তভোগী পরিবারটির।

নিখোঁজ স্বপনের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে তার বাবা সিদ্দিক বেপারী কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই রাতের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, আমার চোখের সামনেই গুলিবিদ্ধ, রক্তাক্ত স্বপনকে ধরে নিয়ে গেল দুর্বৃত্তরা। সে কোথায় আছে, কেমন আছে-কিছুই জানি না। তবে মাথা লক্ষ্য করে যেভাবে গুলি করা হয়েছে, তাতে আমার ছেলে আর বেঁচে নেই। বৃদ্ধ পিতা আক্ষেপ করে বলেন, আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ, মরার আগে ছেলের লাশটাও দেখতে পেলাম না। আমি তখন চিৎকার করে বলেছিলাম-আমার ছেলের লাশটা অন্তত দিয়ে যান, আমি কোনো মামলা-মোকদ্দমা করব না; শুধু মুসলিম হিসেবে ওরে দাফন করতে চাই। কিন্তু তারা আমার কথা শোনেনি, রক্তাক্ত দেহটা স্পিডবোটে তুলে নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে চলে গেল।

সেই রাতে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন: স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কালিদাসখালি চরের ওই রাতের অতর্কিত হামলায় শুধু স্বপনই নন, নিচপলাসী চরের শুকুর আলীর ছেলে জিয়াউল হকও (৩৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। তবে তিনি দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে বর্তমানে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। কিন্তু স্বপনের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনও সম্পূর্ণ অন্ধকারেই রয়ে গেছে। ছেলের শোকে পাগলপ্রায় বৃদ্ধ সিদ্দিক বেপারী এখন নতুন আরেক সংকটে পড়েছেন।

পরিবারটি জানায়, সংসার ও কৃষিকাজের প্রয়োজনে স্বপন স্থানীয় কিছু এনজিও এবং ব্যক্তিপর্যায় থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। সিদ্দিক বেপারী বলেন, ছেলে তো নিখোঁজ, এই বয়সে আমি কীভাবে কিস্তি শোধ করব? একটি এনজিওর তিনটি কিস্তির মধ্যে দুটি শোধ হলেও একটি বাকি আছে। কিস্তির লোকেরা বলেছে, স্বপন যদি মারা গিয়ে থাকে, তবে তার একটা প্রাতিষ্ঠানিক প্রমাণ বা প্রত্যয়নপত্র এনে দিলে কিস্তি মওকুফ করা হবে। কিন্তু ছেলে নিখোঁজ থাকায় কবরস্থান কমিটি বা স্থানীয় প্রশাসন কেউ এই মৃত্যুপ্রমাণ দিতে পারছে না। প্রমাণপত্রের জন্য আমি পাগলের মতো ঘুরছি।

তিনি আরও জানান, অন্য একটি সংস্থা থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা করে এখনও ৬টি কিস্তি বাকি। অন্যদিকে, স্বপন চরের যাদের কাছে টাকা পেতেন, তারা এখন টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করছেন। মাত্র দুজন স্বীকার করলেও তারা টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। দীর্ঘদিনেও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান বা অপরাধীদের চিহ্নিত করতে না পারার বিষয়ে জানতে চাইলে বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেরাজুল হক জানান, স্বপনকে এখনও উদ্ধার বা তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।