ঢাকা | মে ২৩, ২০২৬ - ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

রাজশাহীর বাঘা: ভিক্ষুকমুক্ত উপজেলায় ভিক্ষুকের ছড়াছড়ি

  • আপডেট: Saturday, May 23, 2026 - 12:00 am

লালন উদ্দীন, বাঘা থেকে: যেখানেই মানুষের ভিড়, সেখানেই ভিক্ষুকদের জটলা। বাসাবাড়ির পাশাপাশি মার্কেট, মসজিদ ও মাজারের সামনে ভিড় করছেন তারা। আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে ফিতরা ও জাকাতের টাকা-পয়সা এবং শাড়ি-কাপড় পাওয়ার আশায় অনেকে সরকারি সুবিধা পেয়েও নেমেছেন ভিক্ষাবৃত্তিতে। ফলে ছোট-বড় বিভিন্ন মার্কেট, অভিজাত এলাকা, বাস টার্মিনাল ও রাস্তাঘাটে দিনদিন ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ফলে কার্যত কাজে আসছে না স্থানীয় প্রশাসনের ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রম। রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় সম্প্রতি এমন চিত্রই দেখা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদে বিত্তবানদের দান-খয়রাতকে লক্ষ্য করেই মূলত তারা ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমেছেন। এদের মধ্যে কেউ পেশাদার, আবার কেউ অপেশাদার। এই ভিক্ষুকদের কারও স্বামী মারা গেছেন, আবার কারও স্বামী বেঁচে থাকলেও কর্মহীন। তাদের অনেকে নিজের বাড়িতে বা গুচ্ছগ্রামে থাকেন। তবে বহিরাগত ভিক্ষুকরা রাত কাটান স্থানীয় মাজার কিংবা স্কুল-কলেজের বারান্দায়। গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, বাঘার ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ ও মাজারের প্রবেশপথের দুই ধারে ভিক্ষুকদের দীর্ঘ সারি। এসব ভিক্ষুকের অধিকাংশেরই বয়স বেশি এবং তারা নারী। সেখানে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন ভিক্ষুকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের একেকজনের দৈনিক গড় আয় ৩০০ টাকার কম-বেশি। ঈদুল আজহায় মানুষ দান-খয়রাত বেশি করে বলে এ সময়ে তাদের আয়ও বাড়ে। তবে বেশিরভাগ ভিক্ষুকের দাবি, তারা সরকারি কোনো সুবিধা পান না। ঈদ সামনে রেখে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া ভিজিএফের (ভিলেজ গ্রুপিং ফিডিং) চাল না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।

বাঘা উপজেলার বাজুবাঘা গ্রামের স্বামীপরিত্যক্তা রহিলা খাতুন জানান, তিনি নিজে সরকারি কোনো সুবিধা পাননি। পাঁচ বছর আগে গ্রামের এক মহিলাকে ৩ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে তার মায়ের বয়স্ক ভাতার কার্ড করিয়েছিলেন। তার একটি ছেলে থাকলেও সে কোনো দেখভাল করে না। হিজলপল্লী গ্রামের কাদের নামে এক ভিক্ষুক জানান, ভিজিএফের চাল দেওয়ার জন্য অনেকের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেওয়া হলেও তারটি নেওয়া হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বহিরাগত ভিক্ষুকদের মধ্যে চারঘাট উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের ফিরোজা, হালেমা, রিজিয়া এবং লালপুর উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের নজির মোল্লা বাঘায় এসেছেন। এছাড়া বাঘা উপজেলার জোতনশি গ্রামের রহিলা, হেলালপুর গুচ্ছগ্রামের জায়েদা ও রসেনা, বানিয়াপাড়ার মালেকা, আলাইপুর গ্রামের মোকারুল, মীরগঞ্জের রিজিয়া, চন্ডিপুরের জাকাত, পাকুড়িয়ার রসুনা, চকছাতারির সপুরা, হরিরামপুরের নুরমা, রুস্তমপুরের সকেনা ও মাজেদা, খায়েরহাটের কহিনুর, চন্ডিপুরের মাজেদা, বারশত দিয়ারের নিলুফা এবং মহদিপুরের রোকেয়াসহ অনেকেই এখানে ভিক্ষা করছেন। পাশাপাশি দূরবর্তী রংপুর জেলা থেকে আসা সাবিনা ও রেহেনার মতো ভিক্ষুকরা রাতে স্থানীয় মাজারে আশ্রয় নিচ্ছেন।

কাজে আসছে না পুনর্বাসন প্রকল্প: সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাঘা উপজেলাকে ‘ভিক্ষুকমুক্ত’ ঘোষণা করা হয় এবং শুরু হয় পুনর্বাসনের কাজ। প্রথম পর্যায়ে ৫০ জন ভিক্ষুককে নিয়ে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হলেও অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়তে রাজি হননি। পরবর্তীতে যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেয়েছিলেন, তাদের তালিকা করে ২০২০ সালের ১৭ জুন পুনর্বাসন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় ৮ জন ভিক্ষুককে ছাগল, মুদি দোকান, ভ্যানগাড়ি ও সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়। কিন্তু প্রশাসনের এই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত তাদের ভিক্ষাবৃত্তি থেকে ফেরাতে পারেনি।

ভিক্ষার টাকায় মসজিদে দান: স্বামীর সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমেছেন ৪৪ বছর বয়সী শেফালি খাতুন। ১ কাঠা জমির ওপর একটি টিনশেডের আধাপাকা ঘর রয়েছে তার। সরকারি সুবিধা হিসেবে তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। তবে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ভিক্ষার টাকা জমিয়ে কয়েক বছর আগে একটি মসজিদে ৪০ হাজার টাকা দান করেছেন শেফালি। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিজের খরচ চালানোর পর যা বাঁচে, সেই টাকা জমিয়ে মসজিদে দান করেছেন। এবারও তার ইচ্ছা-ভিক্ষার টাকা জমিয়ে মাদরাসা ও এতিমখানায় দান করবেন। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল বাশার জানান, ঈদকে সামনে রেখে পেশাদার ও অপেশাদার বহু মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিয়েছে। যার কারণে অন্য সময়ের তুলনায় এখন ভিক্ষুকের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়েছে।

বাজুবাঘা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান খন্দকার মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বেঁচে থাকার তাগিদে দারিদ্র্য, পারিবারিক অবহেলা ও মনস্তাত্ত্বিক কারণেই মানুষ ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করে থাকে। তবে উৎসব-পার্বণে ভিক্ষার নামে এক ধরনের অত্যাচার বা জোরজবরদস্তি অনেকাংশেই বিরক্তিকর। এ বিষয়ে বাঘা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শাম্মী আক্তার বলেন, এই উপজেলায় আগে ভিক্ষুক পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কি না, তা আমার জানা ছিল না। তবে সরকারের ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রম যাতে এখানে অব্যাহত থাকে, সে বিষয়ে আমি বর্তমান সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করব।