ঢাকা | মে ২৩, ২০২৬ - ১১:৩৪ অপরাহ্ন

শিরোনাম

চার জেলার মোহনায় পদ্মার দুর্গম চর: ১১ সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে জিম্মি জনপদ

  • আপডেট: Saturday, May 23, 2026 - 10:00 pm

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়া এই চার জেলার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত পদ্মার দুর্গম চরাঞ্চল এখন অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, চরের বিস্তীর্ণ জনপদে যখন-তখন অস্ত্রের মহড়া এবং গুলির শব্দ এখন নিত্যদিনের আতঙ্ক। নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি, বালুমহাল আর চরের জমির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এখানে গড়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র অপরাধী চক্র। সর্বশেষ গত সোমবার গভীর রাতে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাসখালি চরে দুর্ধর্ষ গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে দুইজন গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ জানায়, গুলিবিদ্ধ স্বপন বেপারী (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে সন্ত্রাসীরা নদীপথ দিয়ে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। ঘটনার চারদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো তার কোনো সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজ স্বপনকে উদ্ধারে চরাঞ্চলে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই চরাঞ্চলটি চার জেলার সীমান্ত পয়েন্টে অবস্থিত। দুর্গম এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ‘কাঁকন বাহিনী’সহ অন্তত ১১টি সক্রিয় সন্ত্রাসী গ্রুপ। গত বছরের ২৭ অক্টোবর চরের দখল নিয়ে ত্রিমুখী গোলাগুলিতে তিনজন নিহত হওয়ার পর টনক নড়ে প্রশাসনের। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ৭ নভেম্বর রাতে পুলিশ, র‌্যাব, নৌবাহিনী ও এপিবিএনসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ১ হাজার ২০০ সদস্যের এক বিশাল বহর চরে যৌথ অভিযান চালায়। ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ নামের ওই মেগা অভিযানে ৬৭ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হলেও চরে স্থায়ী শান্তি ফেরেনি। কিছুদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকার পর আবারও তৎপর হয়ে উঠেছে বাহিনীগুলো। বিশেষ করে কুষ্টিয়া অঞ্চলের শীর্ষ সন্ত্রাসী রোকনুজ্জামান কাঁকন ওরফে ‘ইঞ্জিনিয়ার কাঁকন’-এর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর তাণ্ডব এখন চরবাসীকে দিশেহারা করে তুলেছে।

পশুর বাথান ও খেয়াঘাটে চলে প্রকাশ্য লুটপাট: চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ও গবাদি পশু পালন। কিন্তু সন্ত্রাসী বাহিনীর নজর এখন সাধারণ চাষিদের পকেট ও পশুর বাথানের দিকে। গত ১১ মে মধ্য চকরাজাপুর চরের কয়েকজন খামারি ১৭৬টি গরু নিয়ে পলাশি-ফতেপুর মাঠে চরাতে গেলে কাঁকন বাহিনীর একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক তৈরি করে। রাখালদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পুরো বাথান জিম্মি করা হয়। পরে অবশ্য পুলিশ ও বিজিবির দ্রুত হস্তক্ষেপে লুণ্ঠিত গরুগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার রাতে ট্রলারযোগে একদল ডাকাত কালিদাসখালি চরে আসছিল। চরের বাসিন্দা স্বপন বেপারী টর্চলাইটের আলো ফেললে ক্ষিপ্ত হয়ে ডাকাতরা তাকে ও জিয়াউল নামের আরেকজনকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এরপর গুলিবিদ্ধ স্বপনকে তুলে নিয়ে যায় তারা।

যেভাবে চলে চরের অপরাধ সাম্রাজ্য:

চকরাজাপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম জানান, চরের মূল দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে বালুরঘাট এবং নদীর খেয়াঘাটগুলোর একক নিয়ন্ত্রণ। চকরাজাপুরের পূর্বপাশে নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার চরাঞ্চল অবস্থিত। এই পুরো বেল্ট নিয়ন্ত্রণ করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইঞ্জিনিয়ার কাঁকন। সূত্রে জানা গেছে, তার বাহিনীতেই প্রায় ৬ শতাধিক সক্রিয় ক্যাডার রয়েছে। কাঁকন বাহিনী ছাড়াও এই চরে চাঁদাবাজি, ফসল ও জমি দখল এবং খুনের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে মণ্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরীফ কাইগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী এবং সুখচাঁদ ও নাহারুল বাহিনী। ঘাট থেকে শুরু করে ফসলের মাঠ-সবখানেই এদের দিতে হয় নির্দিষ্ট অংকের চাঁদা।

ভৌগোলিক দুর্গমতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা: বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেরাজুল হক জানান, সোমবারের ঘটনার পর পরই পুলিশ চরের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। নিখোঁজ স্বপনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তিনি আরও বলেন, এই চরাঞ্চলটি চার জেলার সীমানায় পড়ার কারণে এবং ভৌগোলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় অপরাধীরা এর বাড়তি সুবিধা পায়। এক জেলায় অপরাধ করে মুহূর্তের মধ্যে ট্রলারযোগে অন্য জেলার সীমানায় বা দুর্গম চরে আত্মগোপন করে তারা। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের অবস্থান চিহ্নিত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তবে চরে স্থায়ী শান্তি ফেরাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে।