ঢাকা | মে ৮, ২০২৬ - ১১:০৩ অপরাহ্ন

আধুনিক নগরীর নিরাপত্তায় বড় বাধা ‘ঝুলন্ত জঞ্জাল’

  • আপডেট: Friday, May 8, 2026 - 10:36 pm

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী মহানগরী দিন দিন আধুনিকতায় সমৃদ্ধ হচ্ছে। আলোকোজ্জ্বল সড়ক আর সুউচ্চ বহুতল ভবনে বদলে যাচ্ছে শহরের অবয়ব। তবে এই বাহ্যিক সৌন্দর্যের আড়ালে ঢেকে যাচ্ছে নীল আকাশ। নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি-সবখানেই এখন রাজত্ব করছে ডিশ, ইন্টারনেট, টেলিফোন ও বিদ্যুতের তারের জঞ্জাল। অপরিকল্পিতভাবে ঝুলে থাকা এসব তার কেবল নগরীর নান্দনিকতাই নষ্ট করছে না, বরং জরুরি সেবার পথে হয়ে দাঁড়িয়েছে এক মরণফাঁদ।

এদিকে, রাজশাহীতে বহুতল ভবনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস বিভাগে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক ‘টার্ন টেবিল লেডার’ (টিটিএল) গাড়ি, যা ২২ তলা পর্যন্ত অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কাজ চালাতে সক্ষম। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দেখা দিচ্ছে ভিন্ন চিত্র।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে তারের জট এতোটাই নিচু যে এই বিশাল গাড়িগুলো নির্দিষ্ট সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে। কোথাও তারে আটকে যাচ্ছে গাড়ির মই, কোথাও আবার ছিঁড়ে যাচ্ছে লাইনের তার। ফলে আগুন নেভানোর চেয়ে গাড়ি সরানো বা তার সামলানোই হয়ে দাঁড়াচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের সক্ষমতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর হয়নি। নিচু হয়ে ঝুলে থাকা তার আমাদের প্রধান অন্তরায়। আমরা ইতিমধ্যে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনকে চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়েছি।

জনজীবনে শঙ্কা ও ভোগান্তি

নগরীর কেন্দ্রস্থল সাহেববাজার, জিরো পয়েন্ট, সোনাদিঘি মোড়সহ আবাসিক এলাকাগুলোতে তারের জাল এতোটাই বিস্তৃত যে অনেক সময় আকাশ দেখাই দায় হয়ে পড়ে। সাহেববাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক আক্ষেপ করে বলেন, দোকানের সামনে তারের যে স্তূপ, তাতে সবসময় শর্ট সার্কিটের ভয়ে থাকি। রাস্তা এমনিতেই সরু, তার ওপর এই তারের জঙ্গল। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার কোনো জায়গাই নেই। শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কণ্ঠেও একই উদ্বেগের সুর। সরু রাস্তায় ঝুলন্ত তারের কারণে জরুরি উদ্ধার কাজ অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে বলে তাদের ধারণা।

নগরীর ভেড়িপাড়া এলাকার শাহাদত হোসেন বলেন, আমরা রাজশাহীর সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রাণের শহরের সৌন্দর্য নিয়ে গর্ব করি। তবে যত্রতত্র ঝুলে থাকা তারের জঞ্জাল আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে শর্ট সার্কিটের ভয়ে আমরা তটস্থ থাকি। কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, এই তারগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিন যাতে বড় কোনো দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।

মালদা কলোনী এলাকার মুন্না শেখ বলেন, আমরা চাই ডিজিটাল সেবার প্রসার ঘটুক, তবে তা যেন মানুষের জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে না হয়। ইন্টারনেট এবং ডিস লাইনের তার যারা টানছেন, তাদের ওপর নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োগ করা প্রয়োজন। প্রতিটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান যেন নিজেদের তারগুলো গুছিয়ে রাখে, সেটি নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কঠোর তদারকি কামনা করছি।

বিষয়টি নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক শহরগুলোতে তারের এই জঞ্জাল মাটির নিচ দিয়ে (আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবলিং) নেয়া হয়। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সহকারী অধ্যাপক মুহাইমিনুল ইসলাম মনে করেন, অপরিকল্পিত এই তার ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শুধুমাত্র রাস্তা প্রশস্ত করলেই হবে না, ড্রেনেজ সিস্টেমের মতো ডিশ ও ইন্টারনেটের তারগুলোও মাটির নিচ দিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাগরিক আন্দোলনের প্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসায়ীদেরও দায়বদ্ধতা নিতে হবে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, রাস্তার ওপর তারের জট শুধু দৃশ্যদূষণ নয়, এটি আমাদের জীবনের জন্য হুমকি। অবিলম্বে সার্ভিস প্রোভাইডারদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা উচিত।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং ফায়ার সার্ভিসের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। তিনি বলেন, আমরা খুব দ্রুত ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় বসব। একটি টেকসই ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব তার সুশৃঙ্খল করা হবে। প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে যাতে রাজশাহীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস