ঢাকা | মে ৭, ২০২৬ - ২:৩৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

একদিনেই ৯ মৃত্যু: বজ্রপাতে বাড়ছে লাশের মিছিল, তলানিতে জনসচেতনতা

  • আপডেট: Wednesday, May 6, 2026 - 10:00 pm

সোনালী ডেস্ক: দেশে কালবৈশাখী মৌসুমের শুরুতেই বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। বুধবার একদিনেই দেশের সাত জেলায় কৃষকসহ অন্তত নয়জন প্রাণ হারিয়েছেন।

একদিকে প্রকৃতি রুদ্রমূর্তি ধারণ করছে, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে মানুষের অসচেতনতা এবং সরকারি প্রকল্পের স্থবিরতা বজ্রপাতকে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ দিচ্ছে।

সরকারি হিসেবে গত এক দশকে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যকর উদ্যোগ এখনো কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

সাত জেলায় লাশের সারি: গতকাল বুধবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত বজ্রাঘাতে নিহত ৯ জনের মধ্যে বেশিরভাগই মাঠে বোরো ধান কাটার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন।

নওগাঁ: নিয়ামতপুর এবং মহাদেবপুর উপজেলায় বজ্রাঘাতে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুরে নিয়ামতপুরের চন্দননগর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে এবং হাজিনগর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। হাজিনগর ইউনিয়নে জমিতে ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে এক শ্রমিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। নিহত শ্রমিক খাসের হাট ঊঠাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তবে তার নাম পরিচয় জানা যায়নি।

এ ছাড়া চন্দননগর ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে জমি থেকে ধান তুলতে গিয়ে বজ্রাঘাতে অনুকূল চন্দ্র মোহন্ত নামে আরও একজন নিহত হন। মহাদেবপুর থানার ওসি ওমর ফারুক বলেন, উপজেলার খাজুর উনিয়নের কুড়াপাড়া গ্রামে জমিতে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে দিলীপ চন্দ্র বর্মন নামে এক কৃষক নিহত হন।

নাটোর: লালপুরে কৃষিজমিতে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে আজিজ মন্ডল (৪৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নের নওপাড়া গ্রামের নওসাড়া সুলতানপুর চরে এ ঘটনা ঘটে। আজিজ মন্ডল ওই গ্রামের মোসলেম মন্ডলের ছেলে। লালপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বিষয়টি জানান।

সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় কবরস্থানের উন্নয়ন কাজ তদারকি করতে গিয়ে বজ্রপাতে আব্দুস সামাদ (৬৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টার দিকে উপজেলার বড়পাঙ্গাসী ইউনিয়নের রাহুলিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আব্দুস সামাদ ওই গ্রামের মৃত মাহামের ছেলে ও কবরস্থান পরিচালনা কমিটির সদস্য।

স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল হোসেন জানান, কবরস্থানে উন্নয়নকাজ চলছিল। আজ বৃষ্টির মধ্যে সেই কাজ তদারকি করতে গিয়ে তিনি বজ্রপাতের শিকার হন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। উল্লাপাড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোক্তারুজ্জামান বলেন, বিষয়টি জানার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। মরদেহটি উদ্ধার করে নিহত পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম: নাগেশ্বরী উপজেলায় ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে ওবায়দুল হক (৫৪) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে উপজেলার বদিজামালপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ওবায়দুল ওই গ্রামের আব্দুল হকের ছেলে। নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ হিল জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

লালমনিরহাট: কালীগঞ্জের ভোটমারী ইউনিয়নের ভুল্যারহাট এলাকায় ভুট্টা খেতে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে ইউসুফ আলী (৩৮) নিহত হন। কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ওসমান গনি বিষয়টি জানান।

ময়মনসিংহ: নান্দাইল উপজেলায় ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে আব্দুর রাশিদ (৬২) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। খারুয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল কদ্দুস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জামালপুর: দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় বজ্রাঘাতে সোহেল মিয়া (৩০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মৃত্যুর পরিসংখ্যানে উদ্বেগ: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে ৩ হাজার ৪২৫ জন মারা গেছেন। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই অর্ধশতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। মৃতদের মধ্যে ৭০ শতাংশই কৃষক, বাকিরা হাওরাঞ্চলের মৎস্যজীবী বা খোলা মাঠে থাকা শিশু। ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাব প্রকট।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে না। মেঘের গর্জন শোনার পরও নিরাপদ আশ্রয়ে না গিয়ে অনেকেই খোলা মাঠে কাজ চালিয়ে যান বা গাছের নিচে আশ্রয় নেন, যা মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সরকারিভাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্রগুলো জনশূন্য মাঠের বদলে নিরাপদ বাজারে বসানো হয়েছে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো এখন অকার্যকর। এছাড়া ১,২৩২ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন না পাওয়ায় মাঠ পর্যায়ের অবকাঠামোগত পরিবর্তন আটকে আছে।

বর্তমান পরিকল্পনা ও করণীয়: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বর্তমানে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণের নতুন পরিকল্পনা করছে। এই শেডগুলোতে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা থাকবে এবং কৃষকরা জরুরি অবস্থায় সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল প্রকল্প দিলেই হবে না, জীবন বাঁচাতে দ্রুত সিপিআর প্রদানের প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সতর্কবার্তা প্রচারের জন্য চিঠি দেয়া হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশানুরূপ সাড়া মিলছে না।

পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা এবং মোবাইল ব্রডকাস্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক পূর্বাভাস পৌঁছে দেয়া এখন সময়ের দাবি। বজ্রপাত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও সঠিক সময়ে নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলে এই অকাল মৃত্যু অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।