ঢাকা | মে ৩, ২০২৬ - ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

রাজশাহীর বাজারে মিষ্টি লিচুর তেতো দাম

  • আপডেট: Saturday, May 2, 2026 - 10:00 pm

স্টাফ রিপোর্টার: বাজারে উঠেছে মৌসুমের অন্যতম রসালো ফল লিচু। তবে শুরুতেই দাম আকাশ ছোঁয়া। প্রতিপিচ ৫ টাকা দরে একশো লিচুর দাম ধরা হচ্ছে পাঁচশো। অতিরিক্ত খরা, গরম ও কম ফলনের কারণে বাজারে সরবরাহ কম থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলছেন বিক্রেতারা। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য মৌসুমের অন্যতম জনপ্রিয় ফল লিচু কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজশাহী নগরীর সাহেববাজার এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি পিস লিচু ৫ থেকে ৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতি ১০০ লিচুর দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। আকার ও মান ভেদে দামের কিছুটা তারতম্য থাকলেও সামগ্রিকভাবে দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।

রাজশাহী নগরীর রেলগেট এলাকার দিনমজুর হামিদ আলী বলেন, শুরুতে বাজারে লিচু দেখেই পরিবারের জন্য কিনতে চেয়েছিলাম। তবে দাম শুনে আর সাহস পায়নি। দিনে ৬০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে একশ লিচুর দাম ৫০০ টাকা হওয়ায় তার পক্ষে কেনা প্রায় অসম্ভব। লিচু কিনলে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করা কঠিন হয়ে যাবে। তাই শেষ পর্যন্ত লিচু না কিনেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে। রাজশাহীর বাজারে লিচুর দাম বেড়ে যাওয়ায় এমন চিত্র শুধু রহিম মিয়ার নয়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের আরও অনেক মানুষের।

নগরীর বাস্তহারাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ঈমন আলী বলেন, লিচু এখনো পুরোপুরি পাকেনি, কিন্তু দাম অনেক বেশি। একশ লিচু কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৫০টি লিচু আড়াইশো টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মৌসুমের শুরুর দিকে সাধারণত লিচুর দাম খানিকটা বেশিই থাকে। তবে এ বছর প্রতিকুল আবহাওয়ার কারণে এই উচ্চমূল্য আরও কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে। সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা থাকলেও তা অনেকটাই নির্ভর করছে আবহাওয়ার ওপর।

বিক্রেতাদের দাবি, দীর্ঘ সময় বৃষ্টির অভাব ও তীব্র তাপদাহের কারণে লিচুর উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অনেক গাছে লিচু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠেনি। পাশাপাশি খরার কারণে অনেক লিচু পরিপক্ব হওয়ার আগেই ফেটে গেছে, ফলে বাজারজাতযোগ্য ফলের পরিমাণ কমে গেছে।

রাজশাহী নগরীর সাহেববাজারের লিচু বিক্রেতা হায়দার আলী বলেন, এ বছর খরার কারণে অনেক লিচু নষ্ট হয়ে গেছে বা ফেটে গেছে। ফলে পাইকারি বাজার থেকেই কম লিচু পাচ্ছি। আগে যেখানে দিনে প্রায় ৫ হাজার লিচু বিক্রি করতাম, এখন ২ হাজার লিচু বিক্রি করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। দাম বেশি হওয়ায় অনেক ক্রেতা শুধু দাম জিজ্ঞেস করেই চলে যাচ্ছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফল উৎপাদনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। রাজশাহীর মতো লিচু উৎপাদন এলাকায় খরা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে, যা বাজারমূল্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার লিচুচাষি আব্দুল মালেক বলেন, আমরা প্রতিবছরই কিছু না কিছু সমস্যার মুখোমুখি হই, কিন্তু এ বছরের মতো এমন পরিস্থিতি আগে দেখিনি। কয়েক দিন আগেও প্রচণ্ড গরমে গাছের মাটি শুকিয়ে গিয়েছিল। পরে হঠাৎ আর্দ্রতা বেড়ে যায়। এতে লিচুর খোসা ফেটে গেছে। অনেক গাছে অর্ধেকের বেশি লিচুই নষ্ট হয়ে গেছে। যদিও গতকদিন বৃষ্টি হয়েছে, তাপদাহ নেই। তবুও আমাদের বড় ধরনের লোকসান গুণতে হবে।

গোদাগাড়ী উপজেলার আরেক চাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, লিচু চাষে অনেক খরচ। সার, কীটনাশক, শ্রমিক- সব মিলিয়ে বিনিয়োগ কম না। কিন্তু এখন যেভাবে লিচু ফেটে নষ্ট হয়েছে, তাতে লাভ তো দূরের কথা, খরচ উঠবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ। এসব কারনেই মৌসুমের শুরুতেই বাজারে লিচুর সরবরাহ কমে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেলায় ৫২৮ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছিল। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৭৬৮ টন। চলতি মৌসুমে আবাদ কিছুটা কমে ৫২৬ হেক্টরে নেমে এলেও উৎপাদন বাড়ার আশায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৭৭৫ টন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গড়ে প্রতি কেজিতে ৪০টি লিচু ধরে হিসাব অনুযায়ী ১০০টি লিচুর ওজন আড়াই কেজি হয়। আর ১০০ লিচুর গড় মূল্য ধরা হয়েছে ৪০০ টাকা। সেই হিসাবে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে অর্ধকোটি টাকার লিচুর ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে; যা আগের তুলনায় কম।

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন গণমাধ্যমকে বলেন, লিচু এখনো পরিপক্ব হয়নি। লিচুর বাজারজাত করতে আরও ১৫-২০দিন সময় লাগতে পারে। মৌসুমের প্রথম লিচু হওয়ায় বাজারে কিছুটা বাড়তি দাম রাখছেন বিক্রেতারা। তবে লিচুর বাজারজাত করা হলে সেই দাম অনেকটাই কমে যাবে বলে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, এ বছর রাজশাহীতে খরা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা অব্যাহত থাকায় লিচু উৎপাদনে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। প্রতি বছর রাজশাহীতে লিচু চাষ বাড়ছে। লাভ হওয়ায় কৃষকরা লিচু চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।