ঢাকা | এপ্রিল ২৮, ২০২৬ - ১:৩৫ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

সড়ক রেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমি ফেরত নেয়া হবে: ভূমিমন্ত্রী মিনু

  • আপডেট: Tuesday, April 28, 2026 - 12:00 am

সোনালী ডেস্ক: রেল, সড়কসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অধীনে থাকা বিপুল পরিমাণ জমি যথাযথভাবে ব্যবহার না হলে তা ফেরত নেয়া হবে এবং অতীতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি অবৈধভাবে জমি দখল করে থাকে, তা আইনের আওতায় এনে ফিরিয়ে নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। তিনি বলেন, রেল, সড়কসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনেক জমি অব্যবহৃত রয়েছে। আমরা এগুলো চিহ্নিত করছি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করব।

প্রসঙ্গত, শুধু রেলের প্রায় ৬২ হাজার একর জমির মধ্যে অব্যবহৃত প্রায় ৮ হাজার ৫৫৪ একর, অবৈধ দখল প্রায় ৬ হাজার ৭৫৪ একর এবং ইজারা দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার একরের বেশি জমি। গতকাল সচিবালয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিজ দপ্তরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

ভূমি রেজিস্ট্রেশন বিভাগকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে আইন, স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রণালয় যুক্ত রয়েছে। তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশন ও নামজারি আলাদা থাকায় জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হয়। আমরা চাই এই প্রক্রিয়াগুলো সমন্বিত হোক, যাতে জনগণ সহজে সেবা পায় এবং দুর্নীতি কমে আসে।

ডিজিটাল সার্ভের মাধ্যমে অতীতের সব অনিয়ম দূর হবে জানিয়ে মিজানুর রহমান মিনু বলেন, যার জমি, সেই মালিকানা নিশ্চিত করা যাবে। এতে জালিয়াতি ও দ্বন্দ্ব অনেকাংশে কমে যাবে। দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম, জটিলতা ও দুর্নীতি দূর করে একটি স্বচ্ছ, জনবান্ধব ও আধুনিক সেবা কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার। ভূমিমন্ত্রী বলেন, শতাব্দী প্রাচীন ব্যবস্থার নানা ত্রুটি কাটিয়ে ধাপে ধাপে একটি ডিজিটাল ও জবাবদিহিমূলক ভূমি প্রশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মিজানুর রহমান মিনু বলেন, বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার সমস্যা নতুন নয়; এর শিকড় বহু পুরোনো ইতিহাসে প্রোথিত। একসময় দেশের সাধারণ মানুষ জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করে কৃষিনির্ভর সমাজ গড়ে তুলেছিল। তারা পুকুর খনন, কৃষি উৎপাদন এবং স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু, পরবর্তীতে বিভিন্ন শাসনামলে, বিশেষ করে বিদেশি শাসকদের সময় ভূমি ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আসে। জমি বিভক্ত হয়ে পরগনা পদ্ধতিতে চলে যায় এবং খাজনা আদায়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়।

তিনি উল্লেখ করেন, ব্রিটিশ আমল থেকে যে আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, তার অনেকাংশ এখনো বহাল রয়েছে। ফলে, সাধারণ মানুষের কাছে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়নি। আমরা সেই জায়গা থেকেই পরিবর্তন আনতে কাজ করছি।

বর্তমান সরকারের লক্ষ্য সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, সরকার জনগণকে শাসন করার জন্য নয়, বরং সেবা দেওয়ার জন্য কাজ করছে। ভূমি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কল সেন্টার চালু, অনলাইন অ্যাপস চালু, জনগণকে সচেতন করা এবং দালাল ও অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

তিনি বলেন, আমরা চাই, একজন সাধারণ মানুষ যেন কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি ভূমি সেবা পেতে পারে। সেই লক্ষ্যেই আইন প্রণয়ন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ভূমি খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন কৃষিজমি রক্ষা। মন্ত্রী বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিজমি সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিতভাবে কৃষিজমি অকৃষি কাজে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য হুমকি।

তিনি জানান, আমরা কৃষিজমি সুরক্ষা আইন পাস করেছি। এখন যে কেউ ইচ্ছা মতো কৃষিজমি নষ্ট করে ভবন বা অন্য কোনো স্থাপনা তৈরি করতে পারবে না। এতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ অনলাইন পদ্ধতিতে জমি কেনাবেচা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে ডিজিটাল জরিপের পাইলট প্রকল্প চালু হয়েছে, যা শিগগিরই সারা দেশে বাস্তবায়ন করা হবে। মাঠ প্রশাসনের অনিয়ম তিনি স্বীকার করেন যে, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে নির্দেশনা মানা হয়নি এবং দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। তবে, বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, আমরা পার্লামেন্টে আইন পাসের মাধ্যমে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করব। শুধু নির্দেশনা নয়, আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হবে, যাতে কেউ তা অমান্য করতে না পারে।

ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, ঐতিহাসিকভাবে যে হারে খাজনা নির্ধারিত হয়েছিল, তা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে, এ বিষয়ে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। জলমহল ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রকৃত জেলেদের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় জেলেদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জলমহল ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভূমি ধ্বংসের একটি নতুন হুমকি হিসেবে মন্ত্রী ‘ভেকু’ বা আধুনিক খনন যন্ত্রের ব্যবহারকে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, এসব যন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত পুকুর খনন করে কৃষিজমি নষ্ট করা হচ্ছে, যা পরিবেশ ও কৃষির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তিনি জানান, এ বিষয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। দ্রুত জমি নষ্টের প্রবণতা বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মাঠ পর্যায়ে জবাবদিহিতা বাড়াতে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আরো সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে হবে এবং তাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে।

মন্ত্রী আরো বলেন, দেশের প্রতিজন সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় ভূমি ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কোথাও অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে তা লিখিতভাবে মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। যেখানে প্রয়োজন, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং পাশাপাশি উন্নয়নমূলক পদক্ষেপও গ্রহণ করা হবে।

নিজের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে ভূমিমন্ত্রী জানান, তিনি এখনো শিখছেন এবং মাঠ পর্যায়ে কাজের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করছেন। তিনি স্বীকার করেন, ভূমি মন্ত্রণালয় একটি বিশাল ক্ষেত্র এবং এর সব দিক বোঝা সময়সাপেক্ষ। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি আধুনিক ও কার্যকর ভূমি প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটাই, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা। ভূমি নিয়ে যেন কোনো মানুষ হয়রানির শিকার না হয়, সেটাই আমরা নিশ্চিত করতে চাই। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।