ঢাকা | এপ্রিল ২৮, ২০২৬ - ৯:৪১ অপরাহ্ন

শিরোনাম

উত্তরাঞ্চলে কালবৈশাখীর তাণ্ডব: অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ ৪ জনের মৃত্যু

  • আপডেট: Tuesday, April 28, 2026 - 12:33 am

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূসহ ৪ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে।

গতকাল সোমবার ভোরে বয়ে যাওয়া এই প্রবল ঝড়ে নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ এবং বগুড়ায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান মাটিতে নুইয়ে পড়েছে। এছাড়া কয়েকশ গাছ উপড়ে এবং বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিশাল এলাকা।

পাকা ধান ও বিদ্যুৎ লাইনে ব্যাপক ক্ষতি: নওগাঁর রাণীনগর এবং আত্রাই উপজেলায় গতকাল সোমবার ভোরে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে নুয়ে পরেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান। এছাড়া ঝড়ে বিদ্যুৎ লাইনের ব্যপক ক্ষতিসহ ভেঙে পরেছে অসংখ্য গাছপালা। উড়ে গেছে ঘর বাড়ীর চালা। এতে বেশ কিছু এলাকা ভোর থেকেই অন্ধকারে রয়েছে। এছাড়া আত্রাইয়ে ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পরে অন্তঃসত্ত্বা এক গৃহবধূ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

রাণীনগর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম জানান, উপজেলায় চলতি মৌসুমে বোরো ধান রোপণ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে। গতকাল সোমবার ভোরে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৪হাজার ৬৮৭হেক্টর জমির পাকা ও আধা পাকা ধান নুয়ে পরেছে। তিনি বলছেন, এতে পাকা ধানের তেমন ক্ষতি হবেনা। তবে মিরাট গ্রামের কৃষক হামিদুল ইসলাম বলেন, ধান নুয়ে পরার কারনে একদিকে যেমন কাটা-মাড়াইয়ের খরচ বেড়ে যাবে অন্য দিকে আর একটু ভারী বৃষ্টি হলে নুয়ে পরা ধান পানির নিচে তলে যাবে। এতে ধানে নতুন করে গাছ গজালে চরম ক্ষতি হবে।

নওগাঁ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১ এর রাণীনগর জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আবু হাসান বলেন, গতকাল সোমবার ভোরে বয়ে যাওয়া ঝড়ে উপজেলার বেতগাড়ী এলাকায় মেইন লাইনের ২টি খুঁটি ভেঙে গেছে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় আড়াই শতাধিক স্থানে গাছ ভেঙে পরে বিদ্যুতের তার ছিরে গেছে। ভোর থেকেই এসব লাইন মেরামতের কাজ চলছে। বেতগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব আলী বলেন, ঝড়ে খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় ভোর থেকেই বিদ্যুত নেই। খাবারের পানি, মোবাইল, অটো চার্জার ভ্যানে চার্জ এবং ফ্রিজের জিনিসপত্র নিয়ে চরম বিপাকে পরেছেন এলাকার লোকজন। রাণীনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ্যদের তালিকা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে এলাকার জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তালিকা চাওয়া হয়েছে।

আত্রাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রসেনজিৎ কুমার জানান, উপজেলায় এই মৌসুমে ১৮ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান রোপন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার ভোরে কালবৈশাখী ঝড়ে উপজেলার বিভিন্ন মাঠে প্রায় ২হাজার ৭৯০হেক্টর জমির পাকা ও আধা পাকা ধান নুয়ে পরেছে। তবে ২/৪দিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে ধানের তেমন ক্ষতি হবে না। এছাড়া বৃষ্টিপাত হলে কিছু ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। উপজেলার সাহেবগঞ্জ সরদার পাড়া গ্রামের কৃষক মোজাম হোসেন বলেন, তার রোপনকৃত ২০বিঘা জমির সবগুলো ধান ঝড়ে নুয়ে পরেছে। আত্রাই পল্লীবিদ্যুৎ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার জসিম উদ্দীন জানান, গতকাল সোমবার ভোরে কালবৈশাখী ঝড়ে উপজেলার সাহেবগঞ্জ, বান্দাইঘারা ও পতিসর এলাকায় অন্তত চারটি খুঁটি ভেঙ্গে গেছে। এছাড়া ১০/১৫স্থানে বিদ্যুৎ লাইনের তার ছিরে গেছে। এছাড়া আরো শতাধীক স্থানে গাছ ভেঙ্গে-উপরে তারের ওপর পরে আছে। এতে ভোর থেকেই ক্ষতিগ্রস্থ্য এলাকায় বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করা আছে। তবে দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে।

অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ নিহত: নওগাঁর আত্রাইয়ে কালবৈশাখী ঝরে ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পরে আরাফাতুন (২০) নামে বেদে পল্লীর এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার ভোর রাতে উপজেলা সদরের রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় খোলাপাড়া নামক স্থানে এঘটনা ঘটে। ঘটনার খবর পেয়ে নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তার স্বামীর নাম ইয়াসিন আরাফাত হোসেন। তারা মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। বেদে পল্লীর বাসিন্দা আবাবিল হোসেন বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে আমরা প্রায় ৩০টির মতো পরিবার নিয়ে খোলাপাড়া বাগানে অস্থায়ী ঘর করে বসবাস করছি।

গতকাল সোমবার ভোর রাতে কালবৈশাখী ঝড় ওঠলে আরাফাত রহমানের ঘরের ওপর একটি ইউক্যালিপ্টাস গাছ ভেঙে পরে গৃহবধূ আরাফাতুন গুরুত্বর আহত হয়। তাকে উদ্ধার করে আত্রাই হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। পরে রাজশাহী নিয়ে যাবার সময় পথি মধ্যে মারা যায়। গৃহবধূ আরাফাতুন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুরে আলম সিদ্দিক, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল করিমসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

উল্লাপাড়ায় গৃহবধূর মৃত্যু: সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে ঘরচাপায় সীমা খাতুন নামে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। ঝড় ও সেই সঙ্গে শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় গাছ উপড়ে বা ভেঙে পড়েছে। এতে সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতায় অন্তত ১৫টি খুঁটি ভেঙে গেছে। গত রোববার সন্ধ্যায় ও রাত ১টার দিকে উল্লাপাড়া উপজেলা এবং আশপাশের এলাকায় কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। মৃত সীমা খাতুন (৪৫) উপজেলার বালসাবাড়ী গ্রামের হবিবর রহমানের স্ত্রী। উল্লাপাড়ার দুর্গানগর ইউনিয়নের সদস্য ফারুক হোসেন জানান, ঝড়ের সময় সীমা খাতুনের ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে। এতে ঘরচাপায় মারা যান সীমা। ঝড় ও সেই সঙ্গে প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি জানান।

সিরাজগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সহকারী মহাব্যবস্থাপক খালিদ আল মুহাইমিন জানান, দুই দফা ঝড়ে এই সমিতির আওতায় সোনতলা, উল্লাপাড়া সদর, সলঙ্গা ও দুর্গানগর, কয়ড়া, সড়াতৈলসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুতের ১৫টি খুঁটি ভেঙে গেছে। গাছ ভেঙে পড়ে অনেক জায়গায় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে যাওয়ায় পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সোমবার সকাল থেকে অন্তত ২০টি দল বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল করতে কাজ করছে। পর্যায়ক্রমে এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি অফিসের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা তাসিন বিন নূর জানান, নাবি ইরি ধানে এখন থোর এসেছে। শিলাবৃষ্টির কারণে এসব ধানের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যেসব ধান পুরোপুরি বা ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে ফেলার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য ক্ষতি কমানো যায়। ইতোমধ্যে উপজেলার সলঙ্গা এলাকায় ৯টি হারভেস্টার নামানো হয়েছে এবং আরও ১৪টি হারভেস্টার মাঠে নামানোর প্রস্তুতি চলছে বলে তিনি জানান।

পোরশায় আদিবাসী নারী নিহত: নওগাঁর পোরশায় বোরো ধান কাটতে গিয়ে লুপসী রানী (৫২) নামে এক আদিবাসী নারী নিহত হয়েছে। সে উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের মাক্তাপুর গ্রামের সুধনা হরিজনের স্ত্রী। জানা গেছে, লুপসী রানী রবিবার গানইর বীলে বোরো ধান কাটতে যায়। ধান কাটা অবস্থায় বিকালে বৃষ্টি শুরু হলে বজ্রপাত ঘটে। ফলে বজ্রপাতে সে ঘটনা স্থলেই নিহত হয়। পোরশা থানা অফিসার ইনচার্জ জিয়াউর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

গাছচাপায় দোকানে থাকা ব্যবসায়ীর মৃত্যু: বগুড়ায় কালবৈশাখী ঝড়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গাবতলীতে গাছ দোকানের উপর ভেঙে পড়ে উমা চন্দ্র রায় (৫২) নামে এক পান ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার ভোরে উপজেলার সুখানপুকুর ইউনিয়নের লাঠিগঞ্জ বাজারে দোকানের ওপর পুরাতন বটগাছ উপড়ে পড়ে। গাবতলী থানার ওসি রাকিব হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন। মৃত উমা চন্দ্র রায় গাবতলী উপজেলার সুখানপুকুর ইউনিয়নের চকরাধিকা পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত কালিদাস রায়ের ছেলে। তিনি লাঠিগঞ্জ বাজারে একটি দোকানে পানের ব্যবসা করতেন।

স্থানীয়রা জানান, সোমবার ভোররাত সাড়ে ৩টার দিকে হঠাৎ প্রবল কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে একটি বিশাল বটগাছ উপড়ে দোকানের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে দোকানটি দুমড়ে মুচড়ে যায় এবং ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা ব্যবসায়ী উমা চন্দ্র রায় গাছের চাপায় ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে গাবতলী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে এসে গাছ কেটে লাশ উদ্ধার করেন।

গাবতলী থানার ওসি রাকিব হোসেন জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহত পান ব্যবসায়ী উমা চন্দ্র রায়ের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।