ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে হানা দিয়েছে পাতা মরা রোগ
রাণীনগর (নওগাঁ) প্রতিনিধি: বরেন্দ্র জনপদ নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠ এখন ইরি-বোরো ধানের সবুজ ও সোনালী রঙের মিতালীতে মুখর। ৮টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন।
তবে সেই স্বপ্নের ওপর কালবৈশাখীর মেঘের মতোই হানা দিয়েছে ‘পাতা মরা’ রোগ। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তের এই রোগাক্রান্ত ধানের দৃশ্য কৃষকদের বুকভরা আশাকে ম্লান করে দিচ্ছে।
তবে এ নিয়ে কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্তা ব্যক্তিদের পরস্পরবিরোধী বক্ত্য পাওয়া গেছে। চাষিরা বলছে, কৃষি কর্মকর্তাদের দেখা না পেয়ে ধানের রোগ বালাই মুক্ত রাখতে নিজেরাই বিভিন্ন কোম্পানীর কীটনাশক প্রয়োগ করছে। কৃষি বিভাগ থেকে ইতিমধ্যে বিএলবি, ব্লাস্ট ও বিপিএইস ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের পরামর্শ প্রদান ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। ধান লাগানোর পর থেকে তেমন কোন রোগ-বালাই দেখা না দিলেও কৃষকরা ধানের ক্ষেতে নিবির পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছে।
শেষ মহুর্তে কিছুটা ছন্দপতনের আশংকা দেখা দিয়েছে। তার পরও স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, যে সমস্ত এলাকায় জমিতে ধানের শীষ আধাপাকা হয়েছে সে সমস্ত জমির ধান ফলনের কোন কমতি হবে না। আধুনিক পদ্ধতিতে আগাম ধান চাষ করায় কোন প্রাকৃতিক দূর্যোগ না থাকায় ইরি-বোরো ধানের ভাল ফলনের সম্ভবনা রয়েছে বলে কৃষি বিভাগ মনে করছেন।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে ১৮ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। এবার রাণীনগরে বরেন্দ্র বহুমূখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গভীর নলকূপ ২৫৭টি, বিদ্যুৎ চালিত ব্যক্তিগত ২০৮টি, নদী থেকে এলএলপি বিদ্যুৎ চালিত পাম্প ৪০টি’র মাধ্যমে আবাদি ইরি-বোরো ধান ক্ষেতে সেচ প্রদান করছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সঠিক সময়ে চারা লাগানো নিবিড় পরিচর্যা, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, যথা সময়ে সেচ দেয়া, সার সংকট না থাকায় চলতি মৌসুমে ধানের ভাল ফলনের সম্ভবনা রয়েছে।
সরজমিনে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে এখন সবুজের পাশাপাশি সোনালী ধানের শীষের আভা চোখে পড়ছে। রাণীনগরে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ধান গাছের সমারোহে বিস্তীর্ণ মাঠ দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। ইরি-বোরো ধান চাষের অনুকূল আবহাওয়া থাকাই যথা সময়ে ধান চাষ করেছে চাষিরা। উপজেলা কৃষি অফিসের ব্যবস্থাপনায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহারে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করছেন মাঠ পর্যায়ে থাকা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা আইপিএম (বালাই সমন্বিত শষ্য ব্যবস্থাপনা) ক্লাবের মাধ্যমে আলোক ফাঁদে এবং ইরি-বোরো ক্ষেতে কুঞ্চি ও গাছের ডাল পুঁতে পোকা মাঁকড় নিধনে কৃষকদের উৎসাহিত করায় রোগবালাই কম দেখা গেছে। তারপরও কিছু কিছু এলাকায় ধানের পাতা মরা রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
উপজেলার বড়গাছা গ্রামের কৃষক জফির উদ্দিনের ছেলে শাহীন জানান, দেউলা তিমোহনী মোড়ে আমরা কয় ভাই মিলে প্রায় ১২ বিঘা জমিতে জিরা জাতের ধান চাষ করেছি। ইতি মধ্যে ধানের শীষের মাথা গড়তে শুরু করেছে। হঠাৎ করে ধানের পাতাগুলো মরে যাচ্ছে। রোগবালাই মুক্ত রাখতে বিভিন্ন কোম্পানীর কীটনাশক প্রয়োগ করেও কোন লাভ হচ্ছে না। কৃষি অফিসের লোকজনদের তেমন সহযোগীতা আমরা পাই না। ধানগুলো দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। আশানুরুপ ফলন নিয়ে হতাশায় আছি।
বড়গাছা ব্লকের উপ-সহকারি কর্মকর্তা ইসতিয়াক আলম জানান, আমি কৃষকের পাশে থেকে সব সময় পরামর্শ দিয়ে আসছি। যে জমির ধানের পাতা মারা যাচ্ছে এর বিশেষ কারণ হচ্ছে চাষিরা নিজে নিজে ধান ক্ষেতে তীব্র খরার মধ্যে অধিক মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ করার কারণে ধানের পাতাগুলো মরে যাচ্ছে। তবে ফলন বিপর্যয়ের কোন আশংকা নাই।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ আফিসার কৃষিবিদ জাহিদুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান চাষ হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বেশ কয়েকটি মাঠে ধান কাটা শুরু হবে। সম্প্রতি ঝড়ের কারণে কিছু এলাকায় ধানের গাছগুলো আঘাত প্রাপ্ত হওয়ায় তীব্র রোদের কারণে পাতাগুলো মরে যাচ্ছে। এই সমস্যা থেকে রক্ষায় চাষি পর্যায় আমরা বিভিন্ন ধরণের পরামর্শসহ লিফলেট বিতরণ করছি। এই সমস্যার কারণে ধানের ফলনে কমতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।











