ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২৮, ২০২৪ - ১০:৪৬ অপরাহ্ন

ইফতারে বাটার মোড়ের জিলাপি

  • আপডেট: Wednesday, April 13, 2022 - 11:17 pm

 

স্টাফ রিপোর্টার: পঞ্চাশের দশকে দোকানটির নাম ছিল ‘রানীবাজার রেস্টুরেন্ট’। কয়েক বছরের মধ্যে সাইনবোর্ডটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আর কোন সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি। দোকানটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘বাটার মোড়ের জিলাপির দোকান’ হিসেবে। দোকানের মেমোতেও এখন লেখা ‘বাটার মোড়ের জিলাপি’। নামহীন এই দোকানটির জিলাপির সুনাম তিন প্রজন্ম ধরে।

এক শ্রেণির মানুষ বাটার মোড়ের জিলাপি ছাড়া ইফতার ভাবতেই পারেন না। বছরের পর বছর দোকানটিতে একই স্বাদের জিলাপি তৈরি হয়। এখানকার কারিগররাও দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেন। সাধারণ সময়ে দোকানটিতে রোজ ৮০ থেকে ৯০ কেজি জিলাপি বিক্রি হয়। রোজায় তা ২০০ কেজি পর্যন্ত হয়। আসরের নামাজের পর লোকজন এখানে জিলাপি কিনতে রাস্তার ওপর রীতিমত লাইনে দাঁড়ান। ক্রেতা সামলাতে হিমশিম খান কারিগর।

দোকানটির যাত্রা শুরু ১৯৬০ সালে। তখন এর মালিক ছিলেন সোয়েব উদ্দিন। তার একমাত্র কারিগর ছিলেন জামিলী সাহা। শুরুতেই এই জিলাপি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে জামিলী সাহার জিলাপির প্যাঁচ দেওয়া শিখে যান তার ছেলে কালিপদ সাহা। ১৯৮০ সালে জামিলী সাহা মারা গেলে প্রধান কারিগর হন কালিপদ সাহা। কালিপদের কাছ থেকে শেখেন সাফাত আলী আর শফিকুল ইসলাম। জিলাপির সুনামের সাথে সাথে সারা শহরের মানুষের কাছে ‘কালিবাবু’ নামে সুপরিচিত হয়ে ওঠা কালিপদ সাহা মারা যান ২০১৭ সালে। এখন প্রধান কারিগর তাঁর শিষ্য সাফাত আলী। সঙ্গে আছেন শফিকুল ইসলাম।

সাফাত আলী দোকানটিতে যোগ দেন ১৯৮২ সালে। আর শফিকুল এসেছেন ১৯৭৬ সালে। মঙ্গলবার সকালে দোকানের সামনে বসে জিলাপি ভাজছিলেন শফিকুল। জিলাপির প্যাঁচ দিতে দিতে বললেন, ‘মাসিক ৩০ টাকা বেতনে এখানে এসেছি। এখন বেতন পাই ১৫ হাজার টাকা। জীবনের বাকিটা সময়ও এই দোকানেই কাটিয়ে দিতে চাই।’

ক্রেতারা মনে করেন, এই দোকানের কারিগরদের হাতেই আসে সুস্বাদু জিলাপি। কীভাবে এটি সম্ভব হয়- জানতে চাইলে শফিকুল বললেন, ‘আসলে কারিগর কিছু না। মহাজন যদি চান, তাহলেই খাবার সুস্বাদু হবে। এ জন্য লাভের আশা কম করতে হবে। এই দোকানের ক্ষেত্রে তাই। মহাজন কয়েক ধরনের ময়দা, ভাল তেল দিয়ে জিলাপি ভাজান। ভাল খাওয়ান। এই ইচ্ছাটা থাকতে হবে। তবে হ্যাঁ, জিলাপি ভাল করতে ভাল পরিশ্রমও করতে হয়।’

শফিকুল যেখানে রসে টইটুম্বুর আর মচমচে জিলাপি বানাচ্ছিলেন, সেখানেই বিক্রি হচ্ছিল। জিলাপি কিনতে এসে সৈয়দ সাবিয়ার রহমান নামের এক ব্যক্তি বললেন, ‘আমার বয়স ৬০। ২০ বছর বয়স থেকে এই জিলাপি খাই। এখন ডায়াবেটিসের ভয়ে কম খাই। কিন্তু ইফতারে এই জিলাপি থাকায় লাগে। তা না হলে মনে হয় ইফতারিটা পরিপূর্ণ হলো না।’

দোকানের প্রতিষ্ঠাতা সোয়েব উদ্দিন মারা যাবার পর তাঁর চার ছেলে এর মালিকানা পান। এরমধ্যে সোহেল খান দোকানটি চালাতেন। গত বছরের নভেম্বরে তিনি মারা যান। গত রোজায় তিনি বলেছিলেন, ‘এখানে অহেতুক দাম বাড়ানো হয় না। উপকরণের দাম কিছু বাড়লেও জিলাপির দাম বাড়ে না। উপকরণের দাম কমার জন্য অপেক্ষা করা হয়। কিন্তু উপকরণের দাম স্থায়ীভাবে বেড়ে গেলে তখন দাম বাড়াতে হয়।’

সোহেলের মৃত্যুর পরও তাঁর সে কথার সত্যতা পাওয়া গেল। রাজশাহীর সাধারণ দোকানগুলোতেই এ বছর ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে জিলাপি বিক্রি হচ্ছে। অথচ এত নামডাকের বাটার মোড়ের জিলাপি বিক্রি করা হচ্ছে ১৪০ টাকায়। দোকানটি এখন চালাচ্ছেন সোহেলের ভাই মো. শামীম। তিনি বললেন, ‘আমরা দাম বাড়াতে চাই না। আর রোজা হলে তো দাম বাড়ানোর কথা চিন্তায় করি না। এ রকম করলে ক্রেতারা এসে বলবেন, রোজার জন্য দাম বাড়িয়ে দিলেন? সে কারণে দোকানের ইতিহাসে কখনও রোজায় দাম বাড়ানো হয়নি। এখন ময়দা, তেল, গ্যাস, চিনি -সবকিছুর দাম বেশি। তাও রোজার মধ্যে জিলাপির দাম বাড়ানো হয়নি। এখনও আমরা এসব উপকরণের দাম কমার অপেক্ষা করছি। শেষপর্যন্ত না কমলে রোজার পর দাম কিছুটা বাড়াতে হবে।’