ঢাকা | মে ১৭, ২০২৬ - ১০:৪৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ভারতীয় গরু অনুপ্রবেশের শঙ্কায় উত্তরাঞ্চলের খামারিরা

  • আপডেট: Sunday, May 17, 2026 - 10:31 pm

জগদীশ রবিদাস: আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিভাগসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে কোরবানির পশুর পর্যাপ্ত জোগান থাকার পরও খামারিদের মনে বিরাজ করছে চরম উৎকণ্ঠা। সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করায় দেশি পশুর ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কায় পড়েছেন এই অঞ্চলের প্রান্তিক ও বাণিজ্যিক খামারিরা। একদিকে তাপদাহ ও গোখাদ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়েছে, অন্যদিকে অবৈধভাবে আসা ভারতীয় গরুর কারণে পশুর বাজার মন্দা থাকায় বড় অঙ্কের লোকসানের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট, তরতিপুর ও সোনাইচন্ডিসহ বিভিন্ন পশুর হাটে প্রচুর দেশি গরু উঠলেও কাক্সিক্ষত ক্রেতার দেখা মিলছে না। খামারিরা বলছেন, হাটগুলোতে চোরাচালানের মাধ্যমে আসা ভারতীয় গরুর উপস্থিতি স্পষ্ট। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ১ লাখ ৬৭ হাজার ২০২টি। বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৫০টি পশু। ফলে স্থানীয় চাহিদার চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বা ৫৮ হাজার ৮৪৮টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এই উদ্বৃত্ত পশু দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করার কথা থাকলেও ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশে স্থানীয় ক্ষুদ্র খামারিরা চরম বিপাকে পড়েছেন।

উপজেলার আটরশিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি পলাশ উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, লোকসানের আতঙ্কে বাড়ি থেকেই ন্যায্য মূল্যের চেয়ে এক লাখ টাকা কমে তিনি একটি বড় গরু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। কালুপুর গ্রামের জাহিদ হাসান জানান, হাটে তিনটি গরু তুললেও ক্রেতারা যে দাম বলছেন, তাতে তাঁর ৩০ হাজার টাকা লোকসান হবে। খামারি পলাশের অভিযোগ, পশুর হাটে নেয়ার পথে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) তল্লাশি ও হয়রানির কারণেও তারা সঠিক সময়ে হাটে পশু নিতে পারছেন না, কারণ অনেক সময় দেশি গরুকে ভারতীয় গরু বলে সন্দেহ করা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও গোখাদ্যের বাড়তি খরচ বাণিজ্যিক খামার ‘রশিদ ফার্ম’-এর মালিক আশরাফুল আলম রশিদ ও শ্রমিক তারেক রহমান সাংবাদিকদের জানান, এ বছর তীব্র তাপদাহের কারণে খামারে সার্বক্ষণিক ফ্যান চালানো ও পানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেড়েছে। তাপদাহে রোগবালাই বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং গাভীর বাচ্চা মারা যাওয়ায় পরিচর্যা খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে ও দানাদার খাদ্য খাইয়ে পশু প্রস্তুত করা হলেও ভারতীয় গরুর কারণে দাম কমে যাওয়ায় এখন খামারের শ্রমিকদের বেতন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থায় তারা সরকারের কাছে সুদমুক্ত ঋণ ও সময়মতো ভ্যাকসিনের দাবি জানিয়েছেন।

প্রভাব পড়েছে বিভাগজুড়ে:

ভারতীয় গরুর এই অবৈধ অনুপ্রবেশের নেতিবাচক প্রভাব শুধু সীমান্ত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে রাজশাহীসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায়। রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার পুরো বিভাগে কোরবানির পশুর মোট চাহিদা ২৪ লাখ। অথচ খামারিরা প্রস্তুত করেছেন প্রায় ৪৩ লাখ গবাদি পশু। চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত ১৯ লাখ পশু (পণ্য বিবরণী অনুযায়ী ১৮ লাখ) দেশের অন্যান্য জেলা ও রাজধানীতে পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। বিভাগে সবচেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত হয়েছে নওগাঁয় (৭ লাখ ৯৭ হাজার ৫১৫টি), এরপর পর্যায়ক্রমে বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহীতে। কিন্তু বিশাল এই জোগানের বিপরীতে ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ ঘটলে বাজারে ধস নামার আশঙ্কা করছেন খামারিরা। রাজশাহী দামকুড়া থানার খামারি আবদুল্লাহ জানান, তাঁর ৫টি গরুর প্রতিটির কাক্সিক্ষত দাম ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা হলেও ক্রেতারা ১ লাখ ১০ থেকে ২০ হাজার টাকার বেশি দাম দিচ্ছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামেই পশু ছেড়ে দিতে হচ্ছে।

সীমান্তে ভারতীয় গরু জব্দের পরিসংখ্যান:

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ গরুর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের টহল ও বিশেষ অভিযান জোরদার করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১ মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে বেশ কিছু ভারতীয় গরুর চালান জব্দ করা হয়। এপ্রিলের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে নীলফামারী ব্যাটালিয়নের (৫৬ বিজিবি) সদস্যরা পঞ্চগড়ের বিভিন্ন সীমান্তে একাধিক অভিযান চালিয়ে মোট ৬টি ভারতীয় গরু উদ্ধার করে, এর মধ্যে ৭ এপ্রিলের অভিযানে ৫টি এবং ৯ এপ্রিল দিবাগত রাতে অমরখানা সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবারীদের ধাওয়া করে আরও ১টি গরু জব্দ করা হয়।

উল্লেখ্য, ৯ এপ্রিলের অভিযানে চোরাকারবারীরা বিজিবির ওপর আক্রমণের চেষ্টা করলে টহল দল এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর মে মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় পৃথক অভিযান পরিচালনা করে ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়ন। ১২ মে সকালে এক অভিযানেই ৪টি গরু উদ্ধারসহ চলতি মাসে তারা মোট ১২টি ভারতীয় গরু জব্দ করতে সক্ষম হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০ লাখ টাকা।

এছাড়া, গত ১৬ মে সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) আওতাধীন সোনাছড়া, বাংলাবাজার, সংগ্রাম, প্রতাপপুর, কলাসেক ও পান্তুমাই বিওপির সীমান্ত এলাকায় বিশেষ চোরাচালান বিরোধী অভিযান চালানো হয়। উক্ত অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় চিনি, সুপারি, মদ ও প্রসাধনী সামগ্রীর পাশাপাশি বেশ কিছু ভারতীয় গরু জব্দ করা হয়, যার পুরো চালানের মোট মূল্য ছিল ১ কোটি ১৮ লাখ টাকারও বেশি। বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, জব্দকৃত এসব গরু ও মালামাল প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থার জন্য স্থানীয় শুল্ক কার্যালয়ে জমা দেয়া হয়েছে।

প্রশাসনের তৎপরতা ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হুঁশিয়ারি:

অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, সীমান্ত দিয়ে রাতের অন্ধকারে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গরু আসার চেষ্টা করা হলে তা জব্দ করা হচ্ছে। নাইট ভিশন ক্যামেরাসহ কঠোর নজরদারির মাধ্যমে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে চোরাচালান বন্ধে বিজিবি তৎপর রয়েছে। প্রকৃত খামারিদের কোনো প্রকার হয়রানি করা হচ্ছে না বলেও তিনি দাবি করেন।

রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. অন্তিম কুমার সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘বিভাগে যে পরিমাণ পশু রয়েছে, তাতে বাইরে থেকে কোনো পশু আমদানির বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই।’ খামারিদের সুরক্ষায় যেন কোনো অবৈধ পশু বাজারে না আসতে পারে, সেজন্য স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। একই সাথে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, অধিক লাভের আশায় পশুকে কোনো প্রকার ক্ষতিকারক মোটাতাজাকরণ ইনজেকশন বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ালে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের মতামত, উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে গবাদি পশু পালন একটি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই মুহূর্তে সীমান্ত পুরোপুরি সিলগালা করে ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে না পারলে এই অঞ্চলের লাখ লাখ খামারি চিরতরে এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন, যা দেশের সামগ্রিক মাংস উৎপাদনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বাজার সংশ্লিষ্টরা।

যা বললেন প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী:

এদিকে, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশের চাহিদা মেটাতে পশুর পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, কোরবানির জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে গরু আনার কোনও প্রয়োজন নেই। দেশে চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি গরু রয়েছে। বাইরে থেকে যেন কোনও পশু দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিজিবি) সর্বোচ্চ সজাগ থাকতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গতকাল রোববার বিকেলে বগুড়া শহরের মম ইন কনভেনশন সেন্টারে ‘টেকসই প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন: আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, বাজার সংযোগ ও ভ্যালু চেইন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন কোরবানি পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ভবিষ্যতে দেশ পশু রপ্তানির দিকেও এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।