ঢাকা | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০২৬ - ২:১০ পূর্বাহ্ন

তানোরে এ বছরও লোকসানে আলু চাষিরা

  • আপডেট: Friday, February 20, 2026 - 10:01 pm

তানোর প্রতিনিধি: রাজশাহীর তানোরে এ বছরও লোকসানের মুখে পড়েছেন আলু চাষিরা। নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ৯ টাকা থেকে সাড়ে ৯ টাকা কেজি। অপরদিকে প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ৫ কেজি করে ঢলন দিতে হচ্ছে। ফলে চরম লোকসান গুণতে হচ্ছে কৃষকদের। ফলন তুলনামূলক ভালো হলেও দাম একেবারেই কম হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ে এবছরও নিঃস্ব হবে হাজার হাজার কৃষক। এতে করে চরমভাবে কপালে ভাজও পড়েছে চাষিদের। গত মঙ্গলবার বিকেলের দিকে গোকুল মোড়ে ট্রাকে আলু লোড করছেন শ্রমিকরা। মলিন মুখে গালে হাত দিয়ে বসে আছেন আলু চাষি। আগাম জাতের আলু তুলে খরচের অর্ধেক টাকাও তুলতে পারছেন চাষিরা। গত মৌসুমে একই কায়দায় লোকসানে পড়েছিলেন চাষিরা। ঘুরে দাঁড়াতে পুনরায় বিল পাড়ের উঁচু জমিতে করেন আগাম জাতের আলু চাষ। লাভের আশায় আগাম আলু চাষ করে চরম ভাবে ধরাসয়ী হয়েছেন।

আলুর বস্তার ওপরে মুলিন মুখে বসে ছিলেন চাষি ফিরোজ কবির। তিনি বলেন, এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। ফলন যা হয়েছে তুলনামূলক ভালো। কিন্তু দাম একেবারেই নেই। প্রতি বিঘায় ফলন হচ্ছে ৪০ বস্তা থেকে ৪৫ বস্তা (৬০ কেজিতে ১ বস্তা)। প্রতি বস্তা আলুর দাম ৬শ’ টাকা থেকে ৭ শ’ টাকা পর্যন্ত। প্রতি বিঘা আলু বিক্রি করে কৃষকরা পাচ্ছেন ২৪ হাজার টাকা থেকে ৩১ হাজার টাকা পর্যন্ত। অপর দিকে প্রতি বিঘায় কৃষকের খরচ হয়েছে ৬০ হাজার টাকা থেকে ঊর্ধ্বে ৬৫ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় কৃষকদেকে লোকসান গুণতে হচ্ছে ৩০ হাজার টাকা থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

আরেক চাষি রইচ বলেন, সাড়ে তিন বিঘা আলু উত্তোলন করে সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে। কুরবান নামের আরেক চাষি জানান, আড়াই বিঘা জমির আলু সাড়ে ৯ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হয়েছে। তারা জানান বিঘায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে পাওয়া যাচ্ছে ২৬/২৮ হাজার টাকা করে। বিঘায় ৩২ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। বিঘা ৩২ হাজার টাকা লোকসান হলে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই। আবার ৫ কেজি করে বাড়তি দিতে হচ্ছে। ৭০ কেজির বস্তা লোড হলেও ৬৫ কেজির দাম পাচ্ছি। যার কারণে বস্তায় ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা করে পাওয়া যাচ্ছে না। বিঘায় ২৫০ কেজি করে বাড়তি আলু নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। যার দাম লাগছে ২ হাজার ৩৭৫ টাকা। ৫ কেজি করে ঢলন না দিলে তারা আলু কিনবেনা। বাড়তিটাই নাকি তাদের লাভ। কারন আলুর দাম নাই।

আবার এখান থেকে আলু ট্রাকে করে খুলনায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করবেন। এখান থেকে খুলনা যাওয়া ও সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করার পর আলু বিক্রি করে। এজন্য জমির কাঁচা আলু নাকি অনেক শুকিয়ে যায়। তাদের সাথে কথা বলার সময় উপস্থিত হন ব্যবসায়ী আইনুল, তিনি জানান, এসব আলু সব যাবে খুলনাতে। সেখানে গিয়ে খুববেশি হলে কেজিতে এক টাকা থেকে দু টাকা বাড়তি দামে বিক্রি করা যাবে। ঢলনের নামে অতিরিক্ত ৫ কেজি করে আলু নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি জানান, জমি থেকে একেবারেই কাঁচা আলু কিনা হচ্ছে। খুলনা মোকামে যেতেই অনেক ওজন কমে যায়। আবার কয়েকদিন বিক্রি করতে না পারলে বেশি পরিমাণ কমে। এজন্য ঢলন নিতে হয়।

মাসুদ নামের আরেক ব্যবসায়ী এসে হাজির হন। তিনি বলেন, গতবারের মত এবারো আলুতে ধরাশায়ী চাষিরা। বিঘায় খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা আর বিক্রি করে পাচ্ছে ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা। বিঘায় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা আবার ঊর্ধ্বে ৩০ হাজার টাকাও লোকসান গুণতে হচ্ছে। গতবার ধরা খেয়ে জমির পরিমান কমিয়ে ঋণ মহাজন করে আলু চাষ করে পুনরায় লোকসান। আমি সাড়ে ৯ টাকা কেজি দরে জর্জিসের ২ বিঘা জমি ও ফজলুর এক বিঘা জমির আলু কিনেছি। মুনসুর নামের আরেক চাষি জানান, রাব্বানী ২৫ কাঠা জমির আলু তুলে সাড়ে ৯ টাকা কেজি করে বিক্রি করেছেন। গতবার তিনি ৮ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে ধরা খেয়ে এবার কমিয়ে ৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেন।

চাষিরা জানান, পুরোদমে আলু তুলা শুরু হয়নি। যারা আগে আলু রোপণ করেছিলেন তাদের আলু উঠতে শুরু করেছে। প্রায় ৮/১০ দিন আগে রহিমা ডাংগা নামক বিলের জমির আলু উঠেছিল। ওই সময় আলুর বাজার ছিল সাড়ে ৯ টাকা কেজি । সে বাজার এখনো চলমান রয়েছে। অবশ্য এবারে জমি লিজ ও বীজ আলু কম দামে পাওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ কিছুটা কম হয়েছে। তবে সার কীটনাশকের অতিরিক্ত দামের কারণে অনেকটা বেড়েছে উৎপাদন খরচ। চাষিরা আরো বলছেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের সময় বিএনপি জামায়াত দলের শীর্ষ নেতারা কৃষি ফসলের ন্যায্য মূল্য যাতে কৃষকরা পায় সে বিষয়ে কথা বলেছে। এমনকি উত্তর অঞ্চলে কৃষির রাজধানী করার ঘোষণাও দিয়েছেন। নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের জন্য মন্ত্রী সভার শপথ হয়েছে। এখন দেখার বিষয় কৃষকের আলুর দাম নিয়ে নতুন সরকার কতটুকু কাজ করেন।

আমাদের অতিরিক্ত লাভের দরকার নেই। উৎপাদন খরচ পেলেই হবে। বাজারে সব রকমের সবজির দাম তুলনামূলক ভালো আছে। শুধু আলুর দাম নেই। আমরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আলু উৎপাদন করছি বলেই এত কম দামে জনসাধারণ আলু খেতে পারছে। যদি এত পরিমাণ উৎপাদন না হত তাহলে হাহাকার পড়ে যেত। আশা করছি নতুন সরকার আলুর দিকে নজর দিয়ে হাজারো চাষিদের পথে বসা থেকে রক্ষা করবেন। তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহম্মেদ বলেন, এবারে উপজেলায় ১২ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৫০ হেক্টর জমির আলু তোলা হয়েছে। হেক্টর প্রতি ২৫ মে:টন করে ফলন হচ্ছে। দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাজ হচ্ছে চাষাবাদে রোগবালাই আছে কিনা ও রোগবালাই হলে দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেয়া দামের বিষয়টি কৃষি বিপণন বিভাগের কাজ বলেও জানান তিনি।