ঢাকা | জানুয়ারী ২২, ২০২৬ - ১:৪৯ পূর্বাহ্ন

বিলুপ্তির পথে গ্রাম বাংলার ‘ঢেঁকি’

  • আপডেট: Wednesday, January 21, 2026 - 9:01 pm

মোজাম্মেল হক, চারঘাট থেকে: এক সময়ের চেনা পরিচিত শব্দ ঢেঁকির ‘ঢপ ঢপ’ আওয়াজে ভোর হতো গ্রামীণ বাংলার দিনগুলো। কিন্তু প্রযুক্তির আগমনে আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার এই পুরনো যন্ত্র ঢেঁকি। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে ঢেঁকি ছিল যেন প্রতিটি বাড়ির অপরিহার্য অংশ। ধান ভানা থেকে শুরু করে চাল তৈরি ও মসুর ডাল কোটা প্রায় সবই হতো এই কাঠের তৈরি যন্ত্রে।

একটা সময় ছিল যখন ঢেঁকি কেবল মাত্র একটি যন্ত্র ছিল না, এটি ছিল গ্রামীণ নারীদের শ্রম, ভালোবাসা ও পারিবারিক জীবনের অংশ। পরিবারের মেয়ে-বউরা একসাথে বসে ঢেঁকি চালাতেন, গল্প করতেন, হাসতেন। যা তৈরি করতো এক  সামাজিক মিলবন্ধন। খাঁটি চাল, ভাঙা ডাল সবকিছুতেই ছিল এই ঢেঁকির ছোঁয়া। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া এবং কালের বিবর্তনে ধান, গম, চাল ভাঙার মেশিনের কারনে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে।

সরেজমিনে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এক সময় এই অঞ্চলে ঢেঁকিতে ধান ভানার ব্যাপক প্রচলন ছিল। বিভিন্ন উৎসবের সময় প্রতিটি বাড়িতে নতুন জামাই মেয়ে ও অতিথিদের উপস্থিতিতে বাড়ি ছিল কোলাহল পূর্ণ। গভীর রাতে ঢেঁকিতে ধান ভানার শব্দ শুনা যেত।

ঢেঁকিতে তৈরি করা চালের গুড়ি দিয়ে গ্রামের ঘরে ঘরে প্রস্তুত করা হতো পুলি, ভাপা, পাটিসাপটা, তেলে ভাজা, চিতইসহ নানা ধরনের পিঠা-পুলি। পিঠার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায়। কিন্তু কালের বির্বতনে ও সময়ের চাহিদা অনুয়ায়ী আধুনিক যন্ত্রপাতি আর্বিভাব হওয়াই কালের গর্ভে ঢেঁকি হারিয়ে গেছে। গ্রামবাংলার এমন চিরায়ত সব ঐতিহ্য এখন শুধুই স্মৃতি।

উপজেলার সরদহ ইউনিয়নের খোর্দ্দগোবিন্দপুর গ্রামের ফুলজান বেওয়া (১১৭) বলেন, এই অঞ্চলে ঢেঁকিতে ধান ভাঙার ব্যাপক প্রচলন ছিল। ঢেঁকিতে ভাঙা চালের ভাতে অনেক পুষ্টি ও সুস্বাধু। এখন মেশিনে ভাঙা চালে ও ভাতে কোন স্বাদ নেই।

একই ইউনিয়নের পলাশবাড়ী গ্রামের নাবাচি বেগম বলেন, আগে সকালে ঢেঁকির শব্দ না শুনলে ঘুম ভাঙত না ঠিক মতো। আর এখন তো শুধু টিভিতেই কেবল ঢেঁকি দেখা যায়। বর্তমানে আধুনিক ধান ভাঙার মেশিন সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় সময়ও কম লাগে। যার ফলে শ্রম নির্ভর ঢেঁকির ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে দ্রুত।

উপজেলা নিমপাড়া ইউনিয়নের পোড়াভিটা গ্রামের তরুণ হাসান আলী এ বিষয়ে বলেন, আমার দাদির মুখে ঢেঁকির গল্প শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে কখনো দেখি নি। বর্তমানে সব কাজই মেশিনে হয়। গ্রাম-গঞ্জে এখনো দুই একটি বাড়িতে ঢেঁকি দেখা গেলেও অদূর ভবিষ্যতে ঢেঁকির প্রচলন থাকবে না বলে মনে করেন সচেতন মহল। ঢেঁকি শিল্প এখন রূপকথার গল্পের মতো।