ঢাকা | অক্টোবর ১৪, ২০২৬ - ২:৪৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

রাজশাহীতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শব্দদূষণ

  • আপডেট: Tuesday, October 13, 2026 - 11:28 pm

স্টাফ রিপোর্টার: নিয়মনীতি ও বিধিমালাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজশাহী নগরজুড়ে বেপরোয়া গতিতে বাড়ছে শব্দদূষণ। এমনকি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো সরকারি ঘোষিত ‘নীরব এলাকা’গুলোতেও থেমে নেই যানবাহনের হাইড্রোলিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত হর্নের তাণ্ডব। ফলে সাধারণ পথচারী, শিক্ষার্থী ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশ শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসের আশেপাশের ১০০ মিটার এলাকা ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে গণ্য। যেখানে দিনে সর্বোচ্চ ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা অনুমোদিত। তবে বাস্তবে এসব নিয়মের কোনো প্রয়োগ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য ও বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পরিমাপ অনুযায়ী, রাজশাহী নগরীর রেলগেট চত্বরে ২০২২ সালে যেখানে শব্দের মাত্রা ছিল ৯০ ডেসিবেল, গত মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৭.২ ডেসিবেলে—যা নির্ধারিত সীমার প্রায় দ্বিগুণ।

নগরীর লক্ষ্মীপুর, তালাইমারী, সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, ভদ্রা, ঢাকা বাসস্ট্যান্ড ও আমচত্বর এলাকার চিত্রও একই রকম। মোড়ে মোড়ে যানজটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কিংবা অনর্থক প্রতিযোগিতা থেকে চালকেরা অহেতুক হর্ন বাজিয়ে চলছেন। তালাইমারী মোড়ে বাস থামা থেকে ছাড়ার মাঝেই একাধিকবার বাজানো হয় উচ্চশব্দের হর্ন, যার তীব্র শব্দ পাশে থাকা রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ভেতরেও পৌঁছায়।

রুয়েটের শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন ও হাসপাতালে ভর্তি স্বজনের সঙ্গে থাকা মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, বাস ও আনসার সদস্যদের বাঁশির বিকট শব্দে পরিবেশ খিটখিটে ও অশান্ত হয়ে ওঠে, যা নিয়ন্ত্রণ বা জনসচেতনতায় কার্যকরী পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট।

বিশ্বের শব্দদূষণ নিয়ে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) প্রকাশিত ‘ফ্রন্টিয়ারস ২০২২’ প্রতিবেদনে ঢাকাসহ রাজশাহীকেও বিশ্বের অন্যতম শব্দদূষণকারী শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, যেখানে রাজশাহীর শব্দমাত্রা ১০৩ ডেসিবেল পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা মনে করছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অটোরিকশার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক আইনের শিথিলতা এবং চালকদের অসচেতনতাই শব্দদূষণ বৃদ্ধির মূল কারণ।

বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, চালকদের হর্ন বাজানো অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই অভ্যাস বদলাতে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার পাশাপাশি কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। এছাড়া শব্দ শোষণে আম, জাম, নিম ও সজনে গাছ লাগিয়ে নগরে সবুজায়ন বাড়ানো দরকার। রাজশাহীতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তরও অভিযান পরিচালনা করছে।

জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকায় ২৮টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং ১২৪টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহনের চালক, ইমাম ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালাও করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার সহকারী পরিচালক কবির হোসেন জানান, আয়তনে ছোট হলেও রাজশাহী শহরে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা অত্যধিক এবং হাতে ইশারা করে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তারা ২৮টি অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ১২৪টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করেছেন। তবে শব্দদূষণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ও সাধারণ মানুষের সচেতনতা জরুরি।

শব্দদূষণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শংকর কে বিশ্বাস বলেন, অতিরিক্ত শব্দ মানুষের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মানসিক অবসাদ এবং শিশুদের মনোযোগ হ্রাসের মূল কারণ। অতিরিক্ত শব্দের প্রভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর হঠাৎ মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই উচ্চ শব্দ অত্যন্ত বিপজ্জনক। শুধুমাত্র কাগজে-কলমে বিধিমালা না রেখে সম্মিলিত প্রশাসনিক পদক্ষেপে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদরা।