ঢাকা | অক্টোবর ১, ২০২৬ - ১২:১০ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

দৃষ্টিনন্দন নগরীতে পদে পদে দুর্ভোগ

  • আপডেট: Wednesday, September 30, 2026 - 10:33 pm

খনন ও দীর্ঘায়িত নির্মাণকাজে স্থবিরতা:


জগদীশ রবিদাস: পরিচ্ছন্নতা, দৃষ্টিনন্দন চওড়া সড়ক আর সৌন্দর্যের জন্য রাজশাহী মহানগরীর সুনাম দেশজুড়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নগরীর সেই চকচকে ও সুশৃঙ্খল রূপে বড় ধাক্কা লেগেছে। রাজশাহী ওয়াসার পাইপলাইন বসানোর ব্যাপক খননকাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে মেগা ওভারপাস বা ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পের ধীরগতির জোড়া ধাক্কায় এখন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। উন্নয়নের এই বিপুল কর্মযজ্ঞকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও দুই সংস্থার কাজের সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতায় চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, রাজশাহী ওয়াসার পানি শোধন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে নগরজুড়ে ব্যাপক পাইপলাইন স্থাপনের কাজ চলছে। এতে ইতোমধ্যেই প্রায় ১৪ কিলোমিটার সড়ক কেটে ফেলা হয়েছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী আরও অন্তত ৩৪ কিলোমিটার সড়ক কাটা হবে। অধিকাংশ জায়গায় পানির পাইপ বসানোর পর অস্থায়ীভাবে মাটিচাপা দিয়ে রাস্তা ঢেকে রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রতিনিয়ত যানবাহন চলাচলের কারণে সেসব স্থানে তৈরি হয়েছে গভীর খানাখন্দ। বিশেষ করে বর্ষার দিনে বৃষ্টি নামলে এই কাটা অংশগুলো রূপ নিচ্ছে কাদাপানির চরে, যা সাধারণ পথচারী ও গাড়ি চালকদের জন্য নিত্যদিনের যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে।

নগরীর তালাইমাড়ি-ভদ্রা সড়কের নর্দানের মোড় থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার অংশজুড়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া চন্দ্রিমা থানার পাশ দিয়ে ভদ্রা-নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল সড়ক, বারোরাস্তা-বুধপাড়া সড়ক, বনগ্রাম থেকে নাদের হাজির মোড়, ছোটবনগ্রাম থেকে ভদ্রা পার্ক, ছোটবনগ্রাম-চকপাড়া মোড়, সাধুর মোড় থেকে অগ্রণী স্কুল, দায়রাপার্ক মোড়, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনের অংশ, বিনোদপুর-মির্জাপুর সড়ক এবং চৌদ্দপাই থেকে বিমান চত্বর সড়কে পাইপলাইন বসাতে ধারাবাহিকভাবে মাটি কাটার কাজ চলছে। গত দুই মাস ধরে চলা এই কাজের প্রভাবে নিয়মিত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

স্থানীয় অটোরিকশাচালক ও শিক্ষার্থীদের সংগৃহীত বিবরণ অনুযায়ী, ভাঙাচোরা এসব সড়কে চলাচল করতে গিয়ে তীব্র শারীরিক ভোগান্তির পাশাপাশি যানবহনের চাকা ও কলকব্জা নষ্ট হয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। ওয়াসার তথ্যানুযায়ী, মূল শহরের মোট ৪৮ কিলোমিটার সড়ক কাটার পরিকল্পনা নিয়ে এই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, কাটা সড়ক দ্রুত মেরামতের জন্য ওয়াসার পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই রাজশাহী সিটি করপোরেশনকে (রাসিক) প্রথম দফায় ১৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ধারিত এলাকার বাকি অংশ কাটার সময় প্রয়োজনীয় অবশিষ্ট অর্থও পরিশোধ করবে ওয়াসা।

তবে নগরবাসীর অভিযোগ, অর্থ হস্তান্তর হলেও সড়ক পুনর্র্নিমাণ বা মেরামতে কার্যকর বা সময়োপযোগী তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী বিভাগীয় সভাপতি আহমেদ সফি উদ্দীনের মতে, ওয়াসা কতটুকু সড়ক কাটবে সে হিসাব আগে থেকেই সিটি করপোরেশনের জানা ছিল এবং ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থও বরাদ্দ হয়েছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সড়ক কাটার পর যাতে তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করা যায়, সে জন্য আগেই দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ঠিকাদার প্রস্তুত রাখা উচিত ছিল। তবে তা না হওয়ায় দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

তবে এই ক্ষয়ক্ষতি ও সড়ক মেরামতে বিলম্বের বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আহমদ আল মঈন পরাগের বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাঁর মতে, সড়ক কাটার সুনির্দিষ্ট পরিমাপ সম্পন্ন করে পর্যায়ক্রমে সংস্কার কাজের টেন্ডার আহ্বান করতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমের কারণে বৃষ্টি চলাকালীন টেকসইভাবে সড়ক সংস্কার করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব নয়। রাসিকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বর মাসের দিকে পরিমাপকৃত সড়কগুলোর টেন্ডার আহ্বান করা হবে এবং পরবর্তীতে সড়ক সংস্কারের মূল কাজ শুরু হবে।

অন্যদিকে, নগরীর সড়ক কাটার পাশাপাশি আরেকটি বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংগুলোতে প্রায় ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন পাঁচটি ফ্লাইওভার ও ওভারপাস প্রকল্প। নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করলেও নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সড়কে যান চলাচল সংকুচিত বা পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া হড়গ্রাম, বন্ধ গেট, বিলশিমলা ও রেলগেট এলাকার এসব প্রকল্প নিয়ে সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, প্রাথমিক নির্ধারিত মেয়াদ ছিল চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত। কিন্তু সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় বর্তমানে প্রথম তিনটি প্রকল্পের সময়সীমা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং রেলগেট প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

প্রকল্পগুলোর ভৌগোলিক পরিমাপ অনুযায়ী, বন্ধ গেট অংশের দৈর্ঘ্য ৯২৭ মিটার, বিলশিমলা অংশ ৭৫৫ মিটার, হড়গ্রাম অংশ ৭৭৫ মিটার এবং রেলগেট প্রকল্পের দুটি অংশের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ১,৩৫০ মিটার ও ৫৯০ মিটার।

রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মাহমুদুল রহমানের দেয়া তথ্যমতে, হরগ্রাম, বন্ধ গেট ও বিলশিমলা ওভারপাসের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ এবং রেলগেট অংশের কাজ প্রায় ৩৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে স্থানীয় নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির আবেদনের ভিত্তিতে যানজট এড়াতে নকশায় পরিবর্তন এবং ভূমি সংলগ্ন সার্ভিস ইউটিলিটি সংযোগ সরানোর জটিলতার কারণে এই বাড়তি সময় লাগছে বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে রাজশাহী নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধি মোহাম্মদ সুমনের দেয়া তথ্যে জানা যায়, পূর্বের নকশায় স্থায়ী যানজটের আশঙ্কা থাকায় ব্যবসায়ীদের দাবিতে সংশোধিত নকশা অনুমোদন করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় ওভারপাসের একটি লেন নিউ মার্কেটের আগেই নামবে এবং আলুকাল মোড় থেকে তা পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হবে। তবে মূল রাস্তা বন্ধ থাকায় বিকল্প রাস্তাগুলোতে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবহন চালকদের দাবিমতে, দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে এক পাশের সড়ক বন্ধ থাকায় সুফল পাওয়ার বদলে তৈরি হয়েছে নতুন যানজট।

প্রকল্পের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের ভাষ্যমতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন পরবর্তী সময়ে বিল পরিশোধ সংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক জটিলতায় কাজের গতি কিছুটা শিথিল হয়েছিল। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তা নিরসন করা হচ্ছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে অন্তত তিনটি ওভারপাস যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

অপরদিকে বন্ধ গেট অংশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ডিয়েনকো লিমিটেড’-এর সাইট প্রকৌশলী আশিকুর রহমানের দেওয়া তথ্যমতে, তাঁদের অংশের কাজ ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে এবং ২০২৭ সালের মার্চ মাসের মধ্যে প্রকল্প হস্তান্তর করা সম্ভব হতে পারে।

সার্বিকভাবে, রাজশাহীর এই বৃহৎ উন্নয়নকাজগুলো ভবিষ্যতে নগরবাসীকে দীর্ঘমেয়াদে সুফল ও স্বস্তি এনে দেবে—এমনটি প্রত্যাশিত হলেও, বর্তমানে কাজের ধীরগতি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে খ্যাত রাজশাহীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে চরম ভোগান্তিতে রূপ নিয়েছে।

সোনালী/জগদীশ রবিদাস