রাজশাহীর পদ্মার চরের ৯৫ শতাংশ শিশু বাল্যবিয়ের শিকার
স্টাফ রিপোর্টার: প্রাথমিকে বই-খাতার পাঠ চুকতেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে রাজশাহীর পদ্মার চরের কন্যাশিশুদের। উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের চরম অভাব এবং সঠিক অবকাঠামো না থাকায় চর মাঝাড়দিয়াড়ে বাল্যবিয়ে এখন এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিলনায়তনে প্রতিদিন নানা সভা, সেমিনার ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারের আয়োজন করা হলেও দুর্গম চরাঞ্চলের এই বিশাল জনগোষ্ঠী সরকারি-বেসরকারি সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।
চর নবীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে কন্যাশিশুদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো এবং তাদের সিংহভাগই উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতেই সেই আগ্রহ রূপ নেয় চরম হতাশায়। স্কুলটির সহকারী শিক্ষক মো. এমদাদুল হক জানান, প্রাথমিক শেষ করার পর এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা কলেজ না থাকায় সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত অভিভাবকরা কম বয়সেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়াকে সবচেয়ে ‘নিরাপদ’ পথ মনে করছেন।
ফলে চরের গ্রামগুলোতে নূপুর ও মুক্তার মতো ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ে হওয়া অত্যন্ত সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। পড়াশোনা ও স্থায়ী আবাসের নিশ্চয়তা না থাকায় চরের অধিকাংশ কিশোরী শৈশব পার হওয়ার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হচ্ছে এবং খুব কম বয়সেই কোলে তুলে নিতে হচ্ছে সন্তানের বোঝা। সরকার মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ রাখলেও চরে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর অভাবে চরের অভিভাবক ও শিশুরা সেই সুফল পাচ্ছেন না।
অথচ যুব উন্নয়ন, সমাজসেবা ও বিসিকসহ সরকারের অন্তত ১০টি দপ্তর এবং ১২টির বেশি এনজিও নারী স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে। এর পাশাপাশি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ৮২টি বাল্যবিয়ে নিরোধ কমিটি ও ৭২টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব খাতায়-কলমে সক্রিয় থাকলেও চরাঞ্চলে তাদের কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই।
স্থানীয় ইউপি সদস্য হুমায়ুন কবির আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, সচেতনতা সৃষ্টির তাগিদ থাকলেও চরে বিয়ের কোনো বিকল্প সামাজিক নিরাপত্তা না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে তাদের উপস্থিতিতেই এসব বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে। যদিও রাজশাহী মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ইসরাত জাহান চরাঞ্চলে উঠান বৈঠক ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির কথা দাবি করেছেন, তবে উন্নয়ন কর্মীরা সরকারি দপ্তরের লোকবল সংকট ও দায়সারা গোছের কাজকে প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন।
এসিডি (অঈউ)-র উন্নয়নকর্মী সুব্রত কুমার পাল ও ‘পরিবর্তন’-এর রাশেদ রিপন জানান, উপজেলা পর্যায়ে তদারকির অভাবে চরের মানুষ বাল্যবিয়ের আইন ও কুফল সম্পর্কে জানতে পারছে না। আইন অনুযায়ী বাল্যবিয়ের দায়ে ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে তা চরে কার্যকর নয়। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, রাজশাহীতে বাল্যবিয়ের হার বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ, যার সিংহভাগই চরাঞ্চলের। ফলে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সরকারি তৎপরতা বাড়ানো না গেলে এই সংকট উত্তরণ সম্ভব নয়।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











