ঢাকা | অগাস্ট ২০, ২০২৬ - ৯:৫৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম

নওগাঁয় বিয়ের কথা বলে বাগানে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয় মেরিনাকে

  • আপডেট: Thursday, August 20, 2026 - 9:50 pm

নওগাঁ ব্যুরো: কথা ছিলো ১৬ তারিখে বিয়ে করবেন। বিয়ের কথা শুনে কিনেছিলেন জুতা, জামা, সঙ্গে নিয়েছিলেন প্রসাধনী সামগ্রী। কিন্তু এই বিয়েই যে তার জীবনের কাল হবে তা জানতেন না মেরিনা বেগম। নওগাঁর ধামইরহাটে গৃহবধূকে হত্যার পর নৃশংসভাবে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া হত্যার কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যলয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, ধামইরহাট এলাকার বাসিন্দা এবং সাবেক মেম্বার বাবুল হোসেন (৪৯) এবং একই এলাকার মোজাম্মেলের ছেলে তারেক রহমান (২১)।

পুলিশ সুপার বলেন, গত পরশুদিন, অর্থাৎ ১৮ই আগস্ট সন্ধ্যায় আমি গোয়েন্দা শাখার (ডিএসবি) মাধ্যমে জানতে পারি একটা পোড়া লাশ ধামইরহাট থানার আমবাগানের মধ্যে পড়ে আছে। সাথে সাথে আমি অফিসার ইনচার্জ, ধামইরহাট থানাকে বড় টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে পাঠাই। সঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকেও (পত্নীতলা সার্কেল) ঘটনাস্থলে পাঠাই। তখন প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি হচ্ছিল এবং এই বৃষ্টির মধ্যেই তারা ঘটনাস্থলে যায়। অলৌকিক ভাবেই হোক আর যাই হোক, যিনি মারা গেছেন, তারই সন্তান ওই একই সময়ে ধামইরহাট থানায় এসেছে তার মায়ের মিসিং জিডি করার জন্য।

যিনি মিসিং জিডি করেছেন, তার সাথে যখন কথা বলে, তখন জানতে পারে যে তার মায়ের নাম মেরিনা বেগম। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে থানা থেকে প্রায় ২৪-২৫ কিলোমিটার দূরে ঘটনাস্থলে আমাদের টিম পৌঁছায়। পুলিশ সেখানে যেয়ে দেখতে পায় যে একজন মধ্যবয়সী মহিলার আগুনে পোড়া মৃতদেহ। তার পাশে ছড়িয়ে আছে তার ব্যবহৃত জিনিস, বিশেষ করে প্রসাধনী সামগ্রী এবং পরিচয়পত্র।

পুলিশ সুপার বলেন, এরপরে যে ব্যক্তি থানায় ডায়েরি করতে এসেছিল, তিনিও পুলিশের গাড়ির পিছনে পিছনে বৃষ্টির মধ্যে মোটরসাইকেল নিয়ে আসছিলেন। এসে এই লাশ দেখে বিশেষ করে এনআইডি কার্ডটা পড়েছিল, সেটা দেখে তিনি শনাক্ত করেন যে তার মা। তিন-চার দিন আগে বের হয়ে গিয়েছিলেন এবং এই লাশটা তার মায়ের।

তাৎক্ষণিক ভাবে বিষয়টা আমরা সিআইডি এবং পিবিআইকে অবহিত করি এবং বিষয়টা আমরা খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরিফের নেতৃত্বে কাজ শুরু করি। আমরা তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় তদন্ত এবং ডাটা বিশ্লেষণ করি কয়েক ঘণ্টা। কয়েক ঘণ্টা ডাটা বিশ্লেষণ করে আমাদের কয়েকজনকে সন্দেহ হয়। এই সন্দেহের ভিত্তিতে আমি শরিফকে অভিযান পরিচালনা করার জন্য নির্দেশনা দেই। মধ্যরাতে প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে আমরা অভিযান পরিচালনা করে স্থানীয় সাবেক মেম্বার বাবুল হোসেন (৪৯) কে গ্রেপ্তার করি। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা অপর আসামি তারেক রহমানকে (২১) গ্রেপ্তার করি। এই দুজনকে আমরা ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করি। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের এক মুহূর্তে তারা আমাদের কাছে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে।

তিনি আরও বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে এই দুজন ছাড়াও আরও দুজন এই হত্যাকাণ্ডের সাথে ছিল। চারজন মিলে তাকে হত্যা করে এবং তার লাশ যাতে শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য পরবর্তীতে পেট্রোল ঢেলে তার মুখমণ্ডলসহ শরীরের ঊর্ধ্বাংশ পুড়িয়ে ফেলা হয়। আমরা জিজ্ঞাসাবাদে যেটি পেয়েছি,মামলার যিনি বাদী (মেরিনা বেগমের ছেলে কাউসার আলী এবং তার স্বামী হাসেন আলী) তারা জীবিকা নির্বাহের জন্য কুমিল্লায় থাকেন। গত ১৪ আগস্ট দুপুরে মেরিনা বেগম বাসা থেকে বের হয়ে যান। বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার মাকে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তারা আবার কুমিল্লা থেকে দ্রুত বাড়ি চলে আসে।

প্রাথমিক তদন্তে আমরা যেটা পেয়েছি ভিকটিম মেরিনা বেগমের সাথে সাবেক মেম্বার বাবুল হোসেনের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল দুধ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে। তাদের মধ্যে মোবাইলে কথা আদান-প্রদান হতো। সম্পর্ক যখন খুব গভীর হয়ে যায়, তখন মেরিনা বেগম তাকে বিয়ের জন্য প্রচণ্ড চাপ দিচ্ছিল এবং বলে যে, “তুমি আমাকে বিয়ে না করলে আমি আত্মহত্যা করব।” তখন এই মেম্বার তাকে বলে যে, “ঠিক আছে, আমি আগামী ১৬ তারিখে তোমাকে বিয়ে করব।”ওই মহিলা বিয়ে করার কথা মনে করে এই প্রসাধন সামগ্রী (কসমোটিক্স, চিরুনি, এনআইডি কার্ড) নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসে।

পুলিশ সুপার বলেন, তখন ওই সাবেক মেম্বার চারজনকে নিয়ে পরিকল্পনা আঁটতে থাকে যে তাকে কীভাবে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে। সেই মোতাবেক ১৬ তারিখ দুপুরবেলা মেরিনা বেগম বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। আর এর মধ্যে আসামি বাবুল, তারেকসহ বাকি দুজনকে মেরিনাকে নেওয়ার জন্য শাহাপুর ইউনিয়নে পাঠায়। শাহাপুর থেকে মেরিনাকে অগ্রাদিগুণ বাজারে রাত আনুমানিক ১০টার সময় নিয়ে আসে। এরপরে তারা অগ্রাদিগুণ বাজার থেকে একত্রিত হয়ে ঘটনাস্থল মনিহারি টু তালপুকুরগামী পাকা রাস্তার মাঝামাঝি দাঁড়ায়। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা রেখে রাস্তা থেকে ৩০০ ফিট দক্ষিণের দিকে ভলকাডাঙ্গা নামে একটা বড় আমবাগানের ভিতরে তাকে অনেকটা জোর করে, ধাক্কাধাক্কি করে নিয়ে যায়।

সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর আসামীগণ পরিকল্পিত ভাবে বাবুলের নির্দেশনায় আসামি তারেক এবং আরও একজন বেল্ট গলায় পেঁচিয়ে দুজন দুই দিকে টান দেয়। তারপর ভদ্রমহিলা পড়ে গেলে, তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা এটা টানতে থাকে। একপর্যায়ে তারা যখন মনে করে যে মারা গেছে, তখন আশেপাশের খরকুটো সংগ্রহ করে এবং বাবুল মেম্বার পেট্রোলগুলো মহিলার গায়ে ছিটিয়ে দেয়। একপর্যায়ে গ্যাসলাইট দিয়ে সেখানে আগুন ধরায় দেয়। আগুন ধরায় দেওয়ার পর তারা যার যার উদ্দেশ্যে চলে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে নওগাঁর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) জয়ব্রত পাল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জিন্নাহ আল মামুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পত্নীতলা সার্কেল) শরিফুল ইসলামসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।