ঢাকা | অগাস্ট ১৯, ২০২৬ - ১১:৩০ অপরাহ্ন

শিরোনাম

অভিযানেও থামছে না ভেজাল দুধ উৎপাদন

  • আপডেট: Wednesday, August 19, 2026 - 10:44 pm

পাবনা প্রতিনিধি: প্রশাসনের ধারাবাহিক সাঁড়াশি অভিযান, মোটা অঙ্কের জরিমানা কিংবা জেলহাজতের দণ্ড- কোনো কিছুই থামাতে পারছে না পাবনার ভেজাল দুধ সিন্ডিকেটকে। অধিক মুনাফা আর রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে এক শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী কেমিকেল দিয়ে নকল দুধ বানানোর কারবার অব্যাহত রেখেছে। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত এসব ভেজাল দুধ সাধারণত খালি চোখে কিংবা সনাতন পদ্ধতিতে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের পাশাপাশি চরম বিপাকে পড়ছেন দুগ্ধ সংগ্রহকারী সংস্থা ও সৎ খামারিরা।

তথ্য বলছে, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলো থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটাসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুধ সংগ্রহ করে থাকে। ভেজাল প্রতিরোধে প্রক্রিয়াজাতকারী হাবগুলোতে এখন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দুধ পরীক্ষা করা হচ্ছে। ল্যাব পরীক্ষায় কেমিকেল বা নকল উপাদান ধরা পড়লেই সরাসরি রিজেক্ট (বাতিল) করা হচ্ছে চালান এবং বাতিল করা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট অসাধু সরবরাহকারীর আইডি (আইডেন্টিফিকেশন নম্বর)। তবে এই কঠোর পদক্ষেপেও রোধ করা যাচ্ছে না অসাধু চক্রগুলোকে। ভেজাল দুধ প্রত্যাখ্যান করায় অনেক সময় সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হচ্ছে তারা। গত বছর পাবনার চাটমোহরে একটি দুধ সংগ্রহকারী হাবের এক কর্মকর্তা ভেজাল শনাক্ত করে দুধ ফেরত দেওয়ায় এবং অসাধু ব্যবসায়ীর আইডি বাতিল করায় তার ওপর সরাসরি হামলার ঘটনা ঘটে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বেড়া, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলার অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রামে প্রকাশ্যে ও গোপনে চলছে বিষাক্ত কেমিকেল মিশ্রিত কৃত্রিম দুধ তৈরির কারখানা। আসল দুধ থেকে ননি তুলে নিয়ে পানি ও সয়াবিন/পাম তেল দিয়ে কৃত্রিম ফ্যাট তৈরি করা হয়। পাশাপাশি ছানার পানির সঙ্গে ডিটারজেন্ট, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ও কস্টিক সোডা মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয় ফেনা ও গাঢ় কৃত্রিম দুধ। সাধারণত ভোর থেকে সকাল ৯টা এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এ কর্মকাণ্ড। অসাধু ব্যবসায়ীদের এমন কর্মকাণ্ডে সাধারণ খামারি ও সৎ ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন। স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন ভোক্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাঁথিয়া ও বেড়ার একাধিক দুগ্ধ সংগ্রহকারী আক্ষেপ করে বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ সংগ্রহের পর তাতে ভেজাল মিশিয়ে বাজার নষ্ট করছে। প্রশাসন দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের দুগ্ধশিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। একটি বেসরকারি দুগ্ধ সংগ্রকারী প্রতিষ্ঠানের মিল্ক কালেকশন হেড শরিফ উদ্দিন তরফদার বলেন, নির্ভেজাল ও শতভাগ খাঁটি দুধ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এই অবস্থানের কারণে গত বছর আমাদের এক কর্মকর্তাকে মেরে আহত করা হয়। এতেও আমরা বিচলিত হইনি। আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়ে ভেজাল দুধ ও এর কারবারিদের মোকাবিলা করছি।

তিনি বলেন, ভেজাল দুধ শনাক্তে আমাদের কারখানায় ডিটারজেন্ট টেস্টসহ বিভিন্ন কিটে কয়েকটি ধাপে পরীক্ষা নিরীক্ষা বাড়ানো হয়েছে। ডিজিটাল এনালাইজারের মাধ্যমেও পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। ফলে চাইলেও ভেজাল দুধ আমাদের হাবে দেওয়ার সুযোগ নেই। ভেজাল নিয়ে এলে তা শনাক্ত করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় তাদের দুধ রিজেক্টের পাশাপাশি সেলার আইডিও বাতিল করা হয়। এতে অনেকেই ক্ষিপ্ত হলেও আমরা সেই ঝুঁকিটা নিয়ে খাঁটি দুধ বাজারে দিচ্ছি। ভেজাল রুখতে খামারিদের আমরা প্রশিক্ষণও দিচ্ছি।

ভাঙ্গুড়ার কয়েকজন খামারি ও স্থানীয় বাসিন্দা জানান, কয়েক বছর আগেও যাদের তেমন কিছু ছিল না, তারা এই ভেজাল দুধ তৈরি করে এখন অনেক টাকার মালিক। ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তিও বেড়েছে। ফলে এ ধরনের অন্যায় ও অবৈধ কাজ করলেও সরাসরি সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটির প্রতিবাদ করা কিছুটা কঠিন। তবুও এর আগে উপজেলার খানমরিচ ইউনিয়নসহ একাধিক জায়গায় ভেজাল দুধ তৈরির সামগ্রী ও ভেজাল দুধ আটক করে প্রশাসনের হাতে দেওয়া হয়। এই অঞ্চলের দুধের যে সুনাম, সেটি এই ভেজাল কারবারিরা নষ্ট করে দিচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

ফরিদপুরের স্থানীয় কয়েক বাসিন্দা বলেন, আমাদের উপজেলাসহ চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, বেড়া ও সাঁথিয়াসহ এসব ভেজাল দুধ উৎপাদনে যারা জড়িত তাদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ আছে বলে আমাদের ধারণা। এরা এই ভেজাল দুধ বাইরেও পাঠায়। এসব ভেজাল দুধ তৈরির বিষয়টি দূর থেকে বোঝাও কঠিন। কারণ তারা কোনো কারখানায় এগুলো তৈরি করে না। নিজের শোবার ঘরে, রান্না ঘরে, এমনকি খড়ির ঘর বা গোয়ালঘরেও এরা ভেজাল দুধ তৈরি করে থাকে। বিভিন্ন সময়ের অভিযানে এগুলো আমাদের সামনে আসে। স্থানীয়ভাবে যারা আমাদের পরিচিত, তাদের পরিবারের লোকদের মাধ্যমে আমরা এই ভেজাল কারবার থেকে সরে আসার পরামর্শ দিলেও অতি লাভের লোভে তারা এখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এগুলো খামারিরা করে না। অসাধু কিছু ব্যবসায়ী এই কাজে জড়িত।

এদিকে ভোজ্য তেল, ডিটারজেন্ট ও কস্টিক সোডা মিশ্রিত বিষাক্ত ভেজাল দুধ মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

পাবনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. খায়রুল কবির বলেন, ভেজাল দুধে কোন কোন কেমিকেল বা ক্ষতিকারক পদার্থ ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিটা তার ওপর নির্ভর করে। তবে কিডনিজনিতসহ ক্যানসার ও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে কিডজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এছাড়া অঙ্গহানি বা দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগও হতে পারে। এক্ষেত্রে যেকোনো মূল্যে এই ভেজাল দুধ উৎপাদন বন্ধ করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা বাজারে ভোক্তা অধিকার ও ফরিদপুর উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানে কেয়া ডেইরিকে ৩ লাখ, আমিনা ডেইরিকে ৩০ হাজার এবং প্রিমিয়াম ফুডকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে বেড়ার নাকালিয়া ও পেঁচাকোলা বাজারে অভিযান চালিয়ে ভেজাল দুধ তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে ১২ বছর ধরে ভেজাল দুধ তৈরিতে যুক্ত জয়দেব ঘোষ নামের এক ব্যবসায়ীকে ২ লাখ টাকা জরিমানা ও এক বছরের কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সর্বশেষ ভাঙ্গুড়া উপজেলার সিংগাড়ি গ্রামে উপজেলা প্রশাসনের এক বিশেষ অভিযানে আশরাফুল আলী নামের এক ব্যক্তিকে ২০০ লিটার ভেজাল দুধ এবং বিষাক্ত কেমিকেলসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তাকে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এভাবে প্রতিনিয়তই অভিযান পরিচালনা করছে প্রশাসন।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান রনি জানান, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানে রয়েছে। আমরা যখন তথ্য পাচ্ছি তখন গিয়ে অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু সেখানে গিয়ে সাধারণত উৎপাদনরত অবস্থায় তাদের পাওয়া যায় না। আবার ভেজাল দুধ পরীক্ষার ল্যাব বা উপকরণ সাপোর্ট আমাদের নেই। রাজশাহী থেকে মাসে একদিন আসে। ফলে চাইলেও তাদের শাস্তির আওতায় আনা কঠিন হয়ে যায়।

তিনি বলেন, তবে অভিযানে গিয়ে যদি তাদের কাছে ভেজাল দুধ উৎপাদনের নানা উপকরণ মেলে, তখন ওই আলোকে তাদের শাস্তি বা জরিমানা করা হয়। আবার এগুলো পাওয়াও তেমন সহজ নয়। কারণ কেউ কেউ নিজের শোবার ঘরেও এই কার্যক্রম করে থাকে। গোপনে উৎপাদন শেষে উপকরণগুলো সরিয়ে ফেলে। এদিক থেকে এই সিন্ডিকেট রুখতে এগুলো আসলে পর্যাপ্ত নয়। ভেজাল রোধ করতে আধুনিক ল্যাব সাপোর্ট জরুরি। তবুও এরমধ্যে যতটুকু সম্ভব আমরা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।

এ ব্যাপারে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ভেজাল দুধ সঠিকভাবে শনাক্ত করার জন্য উন্নত ল্যাব সুবিধা জরুরি, যা বর্তমানে পাবনায় নেই। রাজশাহী থেকে মাসে মাত্র একবার ভ্রাম্যমাণ ল্যাব আসে। পাবনায় একটি স্থায়ী আধুনিক ল্যাব স্থাপন করা গেলে এই অসাধু চক্রকে রোধ করা অনেকাংশেই সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে এই ল্যাব স্থাপনে আমরা চেষ্টা করছি।