ঢাকা | এপ্রিল ১৩, ২০২৬ - ৪:১৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

রাজশাহীর চারঘাটে পানিতে ডুবে এক বছরে ৩২ শিশুর প্রাণহানী

  • আপডেট: Sunday, April 12, 2026 - 10:10 pm

স্টাফ রিপোর্টার: পদ্মা আর বড়াল নদী ঘেরা চারঘাট উপজেলায় গত এক বছরে পানিতে ডুবে মারা গেছে ৩২ জন। নদী ছাড়াও উপজেলাজুড়ে খাল ও মাছ চাষের অসংখ্য পুকুর যেন নীরব মৃত্যুফাঁদ। ধীরে ধীরে মৃত্যুহার বাড়লেও এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে নেই কোনো উদ্যোগ। এমনকি উপজেলা ফায়ার স্টেশনের উদ্ধারকাজের সক্ষমতাও নেই।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও থানার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পানিতে ডুবে ২০২৪ সালে ২৩ জন ও ২০২৩ সালে ১৯ জন মারা গেছেন। গত এক বছরে মারা গেছেন ৩২ জন। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বাড়ির আশপাশে থাকা পুকুর বা নদীতে। শিশুরা খেলতে গিয়ে কিংবা হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যায় পানিতে। পরিবার অনেক সময় বুঝতেই পারে না কখন কী ঘটে গেল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিলে এমন মৃত্যু অনেকটাই কমানো সম্ভব। স্কুল পর্যায়ে সাঁতার শিক্ষা চালু করা এবং মাঝে মাঝে সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। জলাশয়ের ধারে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয়দের মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে ডুবুরি দল গড়ে তোলা এবং ফায়ার সার্ভিসের উপজেলা পর্যায়ে ডুবুরি দল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করা উচিত।

গত বুধবার সকালে উপজেলার ইউসুফপুর ইউনিয়নের টাঙ্গন এলাকায় পদ্মা নদীতে ডুবে মারা গেছে চার বছরের শিশু ফাতেমা খাতুন। তার মা কাপড় ধুতে গিয়েছিলেন নদীতে। ফাতেমা নদীর পারে বসে ছিল। হঠাৎ পানিতে পড়ে গেলে মায়ের চিৎকারে লোকজন জড়ো হন। তবে তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের জসিম উদ্দিনের দুই বছর বয়সী ছেলে ইসমাইল হোসেনও মারা গেছে পদ্মায় ডুবে। পরিবারের সদস্যরা কাজে ব্যস্ত ছিল। ইসমাইল হেঁটে গিয়ে পানিতে পড়ে। চামটা গ্রামের ১৫ মাস বয়সী রাইসা গত ২৯ নভেম্বর উঠানে খেলার এক পর্যায়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পাশের পুকুরে গিয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

চারঘাট নদী ও খালবেষ্টিত এলাকা হলেও অনেক শিশু-কিশোর সাঁতার জানে না। গত ৩ নভেম্বর চারঘাট স্লুইসগেট সংলগ্ন বড়াল নদীতে ডুবে মৃত্যু হয় দুই কিশোর রিহান ইসলাম ও মাহিদ হোসেনের। দুজনই এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। মাঠে ফুটবল খেলা শেষে নদীতে গোসলে নেমে স্রোতের কারণে তলিয়ে যায়। তারা সাঁতার জানত না।  ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বাড়লেও চারঘাটে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নেই। স্কুল, স্থানীয় প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

চারঘাট পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী সাঁতার জানে না। খরস্রোতা পদ্মা ও বড়ালের কাছেই অনেকের বাড়ি। স্কুল-কলেজে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারিভাবে শিক্ষার্থীদের সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা রাখা উচিত। পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপ চারঘাট উপজেলা শাখার অ্যাম্বাসাডর আঞ্জুমান আরা বলেন, সড়কে নিরাপত্তা নিয়ে কথা হয়, কিন্তু পানিতে ডুবে যাওয়ার বিষয়টা গুরুত্ব পায় না। উপজেলা পর্যায়ে সড়ক দুর্ঘটনার চেয়ে পানিতে ডুবে বেশি মৃত্যু হচ্ছে। মানুষ এখনও এটিকে দুর্ভাগ্য হিসেবে মেনে নেয়, প্রতিরোধযোগ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে না।

পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ফায়ার সার্ভিসকে জানানোর পর তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ডুবুরি না থাকায় উদ্ধারকাজ চালাতে পারে না। উপজেলার থানাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বদিউজ্জামান বলেন, রিহান ও মাহিদ নামে দুই কিশোর বড়াল নদীতে ডুবে মারা যাওয়ার সময় পানি খুব বেশি ছিল না। তবে তীব্র স্রোত ছিল। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে এলেও তারা নদীতে নামতে পারেনি। কারণ, পানি থেকে উদ্ধারের ডুবুরি তাদের নেই। এতে স্থানীয় জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

চারঘাট ফায়ার স্টেশন কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, উপজেলা পর্যায়ে কোনো ডুবুরি নেই। বিভাগীয় পর্যায় থেকে ডুবুরি আসতে অনেক সময় লাগে। আমরা খবর পেলেই ঘটনাস্থলে যাই, কিন্তু ডুবুরি না থাকায় দ্রুত উদ্ধারকাজ করা সম্ভব হয় না। ফায়ার সার্ভিস রাজশাহীর সহকারী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিভাগীয় পর্যায় থেকে আমাদের ডুবুরিরা পুরো বিভাগের কাজ করেন। এতে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়। প্রতিটি জেলার জন্য আলাদা ডুবুরি সম্প্রসারণ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে দেয়া আছে। সেটা বাস্তবায়ন হলে খুব দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হবে।