ঢাকা | এপ্রিল ৯, ২০২৬ - ৩:১৩ পূর্বাহ্ন

তেল নেই, সেচ নেই: রাজশাহীর কৃষকের হাহাকার

  • আপডেট: Wednesday, April 8, 2026 - 10:03 pm

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় তীব্র জ্বালানি তেল সঙ্কটে অনেকটাই ভেঙে পড়েছে স্থানীয় সেচব্যবস্থা। এর সরাসরি প্রভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক। তেলের অভাবে সেচযন্ত্র বন্ধ থাকায় পানির তৃষ্ণায় খাঁ খাঁ করছে ফসলের মাঠ, শুকিয়ে যাচ্ছে বোরো ধানসহ পটল, মরিচ ও পানের বরজ। এক ফোঁটা তেলের আশায় কৃষকরা মাইলের পর মাইল ছুটছেন; কেউবা আবার সেচ পাম্প কাঁধে নিয়েই হন্যে হয়ে ঘুরছেন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। এই নজিরবিহীন সঙ্কটে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা কৃষকদের মনে চরম দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে।

বুধবার পবা উপজেলার শাহ্ মখদুম এয়ারপোর্ট এলাকার মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তেলের অপেক্ষায় ছিলেন মোহনপুর উপজেলার মৌগাছী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল বারি। নিজের সেচযন্ত্র সঙ্গে নিয়ে তিনি পেট্রলের সন্ধানে সেখানে আসেন। কৃষক আব্দুল বারি সাংবাদিকদের জানান, তাদের এলাকায় ডিজেল পাওয়া গেলেও পেট্রল মিলছে না। এতে সেচযন্ত্র চালানো বন্ধ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘সেচ দেয়া যাচ্ছে না। পটলের আবাদ, মরিচের আবাদ, বোরো ধান সব রোদে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে পটোলের গাছ মরে যাচ্ছে স্রেফ সেচের অভাবে।’ তিনি আরও জানান, প্রতিদিন তেলের খোঁজে ঘুরে কৃষকদের সময়, শ্রম ও টাকা সবই নষ্ট হচ্ছে। নিজ এলাকায় তেল না পেয়ে নিরুপায় হয়ে তিনি সেচযন্ত্র মাথায় করে পাম্পে এসেছেন, শুধু ফসল বাঁচানোর আশায়।

একই স্টেশনে তেল নিতে আসা আরেক কৃষক সিহাব সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাড়ির আশপাশের দোকান বা পাম্পে তেল না পেয়ে তাদের দূর-দূরান্তে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি যাতায়াত খরচও গুণতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আগে আমরা বাড়ির কাছেই তেল পেতাম, সেখান থেকে নিয়ে গিয়ে সেচ দিতাম, সুবিধা হতো। এখন গাড়ি নিয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ করে এখানে আসতে হচ্ছে।’ কৃষক সিহাবের অভিযোগ, এত দূর থেকে এসেও প্রয়োজন অনুযায়ী তেল মিলছে না।

তিনি বলেন, ‘১৩ কিলো দূর থেকে আসছি তেল নিতে। এসে দেখি মাত্র ৩০০ টাকার তেল দিচ্ছে। এই তেল দিয়ে আমাদের কি চলবে?’ তিনি জানান, পাঁচ কাঠা জমিতে সেচ দিতে গেলেই ৩০০ টাকার তেল শেষ হয়ে যায়। এতে পান, পাটসহ বিভিন্ন ফসলের সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান মোহনপুরের মৌগাছী ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের কৃষক মোজাফফর মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘পানের বরজ, পেঁয়াজ, পটল ও পাটের আবাদে সেচ দিতে পেট্রল জরুরি। কিন্তু ১৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পাম্পে এসে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৩০০ টাকার তেল।’

কৃষক মোজাফফর মণ্ডল বলেন, ‘১৩ কিলো দূর থেকে আইসা আমরা ৩০০ টাকার তেল পেলাম। এই ৩০০ টাকার তেলে আমার মাত্র পাঁচ কাঠা মাটি ভেজাতেই শেষ হয়ে যাবে। তাহলে আমার চলবে কীভাবে?’ তিনি জানান, গম কাটার পর এখন পাটের জমিতে সেচ দিয়ে বপনের প্রস্তুতি নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু জ্বালানির অভাবে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে। তার ভাষায়, ‘বর্তমানে যে তেলের সঙ্কট দেখা দিয়েছে, এতে আমার এবার কোনো মতেই পাট বোনা হবে না।’

কৃষকদের অভিযোগ, জ্বালানির এই সঙ্কট এখন শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তির বিষয় নয়; এটি কৃষি উৎপাদনের ওপরও সরাসরি আঘাত হানছে। সময়মতো সেচ দিতে না পারলে চলতি মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকেরা।

তবে পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পবা উপজেলার মেসার্স হাবিব ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক রাকিব বলেন, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যে পরিমাণ তেল বরাদ্দ আসছে, তা প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রত্যয়নপত্র যাচাই করে কৃষকদের মধ্যে দেয়া হচ্ছে।

রাজশাহী পবা উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও ওই ফিলিং স্টেশনের ট্যাগ কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন আল মামুন সাংবাদিকদের বলেন, কৃষিকাজের সুবিধার জন্য কৃষি কার্ড ও প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন চাহিদা অনুযায়ী কৃষকদের তেল দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, সেই চেষ্টা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।

কৃষকেরা বলছেন, দ্রুত পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে সেচব্যবস্থা আরও ভেঙে পড়বে এবং চলতি মৌসুমে কৃষিখাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই ফসল বাঁচাতে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে অবিলম্বে জ্বালানি তেলের সঙ্কট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।