ঢাকা | এপ্রিল ৮, ২০২৬ - ১২:৫৫ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

বালুমহাল ইজারা নিয়ে ‘তুঘলকি কাণ্ড’, রাজস্ব গিলে খাচ্ছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট

  • আপডেট: Tuesday, April 7, 2026 - 9:19 pm

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যুরো: চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার রানীনগর বালুমহাল ইজারা প্রদানকে কেন্দ্র করে জেলা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা কমিটির বিরুদ্ধে ‘তুঘলকি কাণ্ড’ ও নজিরবিহীন কূটকৌশলের অভিযোগ উঠেছে। প্রথম দফায় ১১ কোটি টাকার বেশি দর উঠলেও রহস্যজনক কারণে তা গ্রহণ না করে দফায় দফায় দরপত্র আহ্বান করায় সরকারের অন্ততঃ ৮ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রভাবশালী মহলকে নামমাত্র মূল্যে বালুমহাল পাইয়ে দিতেই জেলা প্রশাসনের একটি পক্ষ এই ‘পদ্ধতিগত লুটপাটের’ ক্ষেত্র তৈরি করছে (যা চলমান)।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৬ মার্চ প্রথম দফার দরপত্র আহ্বানে মেসার্স সাজেদা এন্টারপ্রাইজ সর্বোচ্চ ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দর দাখিল করে। সরকারি নির্ধারিত মূল্য ২ কোটি ৭৯ লাখ টাকার বিপরীতে এটি ছিল কয়েকগুণ বেশি আয়। কিন্তু আয়কর রিটার্ন ও ব্যাংক সলভেন্সির মতো সাধারণ কিছু কাগজপত্রের ঘাটতি দেখিয়ে এই বিপুল অংকের প্রস্তাবটি বাতিল করে দেওয়া হয়। অভিযোগ আছে, সরকারি নিয়ম অনুসারে প্রতি দফায় আহবানকৃত দরপত্র নির্দিষ্ট সময় সময় দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রচারের নিয়ম থাকলেও কর্তৃপক্ষে মাত্র দুই/তিনদিন সময় দেয়। সেই নিয়মের তোয়াক্কা করেনি।

ঠিকাদারদের দাবি, সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী জনস্বার্থে এবং রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে সর্বোচ্চ দরদাতাকে নথিপত্র সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও এখানে তা করা হয়নি। কেন বড় অংকের রাজস্বের প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দেওয়া হলো, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম দফার পর ৩১ মার্চ দ্বিতীয় দফার দরপত্র জমা নেওয়া হয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এই দফায় দরপত্রের (দরের) ব্যাপক পতন ঘটে। যে মেসার্স সাজেদা এন্টারপ্রাইজ প্রথমবার ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দিতে চেয়েছিল, দ্বিতীয়বার তারা দর দেয় মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা।

অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সরকার অন্তত ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা রাজস্ব হারানোর পথে এগিয়ে যায়। মজার ব্যাপার হলো, দ্বিতীয় দফায় কোনো ত্রুটি না থাকার সত্ত্বেও বালুমহাল কমিটি এবার ‘বাজার মূল্য বিবেচনায় খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে পুনরায় দরপত্র বাতিল করে এবং আগামী ৯ এপ্রিল তৃতীয় দফায় (সংশোধিত) দরপত্র আহ্বান জানায়। একের পর এক দরপত্র বাতিল করার এই প্রক্রিয়াকে স্থানীয়রা ‘প্রশাসনিক নাটক’ বলে অভিহিত করছেন।

অভিযোগ উঠেছে, পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট। তারা অন্যান্য দরদাতাদের দরপত্র দাখিলে সরাসরি বাধা দিচ্ছে এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে মাঠ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। গুঞ্জন ছড়িয়েছে, ওই প্রভাবশালী মহলটি জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, সাবেক দুই এমপি, অন্যান্য ঠিকাদারদের প্রায় দেড় কোটি টাকার বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করেছে। লক্ষ্য একটাই-সরকারকে কম রাজস্ব দিয়ে নামমাত্র মূল্যে এই বিশাল বালুমহালটি নিজেদের দখলে নেওয়া।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ক্ষুদ্র ঠিকাদার জানান, বালুমহাল ইজারা এখন সাধারণ ব্যবসায়ীদের হাতের বাইরে চলে গেছে। প্রভাবশালীরা দরপত্র জমা দিতে দিচ্ছে না। এমনকি দরপত্র গ্রহণের দিন জেলা প্রশাসকের অফিসের আশেপাশেও তাদের লোকজন পাহারা দিতে দেখা যায়। আমরা দরপত্র জমা দিতে না পারলে সরকার কাক্সিক্ষত রাজস্ব পাবে কোথা থেকে? সচেতন মহলের প্রশ্ন, যেখানে প্রথম দফাতেই সরকার ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা অতিরিক্ত মুনাফা পেতে পারত, সেখানে কেন বারবার সময়ক্ষেপণ করে ইজারার মূল্য কমিয়ে আনা হচ্ছে? এটি কি বালুমহাল ইজারা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, সিন্ডিকেট এবং বিপুল অংকের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেসার্স সাজেদা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রাসেল আহম্মেদ। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের কারণেই দ্বিতীয় দফায় দর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তার।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী রাসেল আহম্মেদ জানান, প্রথম দফায় তারা সর্বোচ্চ ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দরপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে কিছু ত্রুটি থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই দরপত্রটি বাতিল করে দেয়। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় দরপত্রের মূল্য ৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা কমিয়ে মাত্র ৩ কোটি ২০ লাখ টাকায় কেন নামিয়ে আনা হলো-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে আমরা দর কমাতে বাধ্য হয়েছি। ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা বিবেচনা করেই দ্বিতীয় দফায় যুক্তিসঙ্গত মূল্য ধরা হয়েছে। সিন্ডিকেট করে অন্য ঠিকাদারদের দরপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগকে তিনি ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেন।

তিনি বলেন, আমি কিংবা আমার কোনো লোক কাউকে বাধা প্রদান করেনি। একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও সাবেক দুইজন সংসদ সদস্যসহ একাধিক ঠিকাদারকে দেড় কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে বালুমহাল দখলের চেষ্টার যে অভিযোগ উঠেছে, তাকেও সম্পূর্ণ বানোয়াট বলে আখ্যা দেন রাসেল আহম্মেদ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আইন মেনেই তারা ইজারা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করছেন।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জেলা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আবু ছালেহ মুসা জঙ্গী এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রথম দফায় তিনটি দরপত্র জমা হলেও সেগুলো কাগজপত্রে ত্রুটি থাকায় অযোগ্য বিবেচনায় বাতিল করা হয়েছে। তবে, সাধারণ কাগজপত্রে ঘাটতি থাকলেও সংশোধনের সুযোগ না দেওয়ার কারণ কি। এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বালুমহল কমিটি এক্ষেত্রে তারা বেটার প্রাইস পাওয়ার ক্ষেত্রে একাধিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে, ত্রুটি না থাকার পরেও দ্বিতীয় দরপত্রের বাতিলের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি কি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, দরপত্রে কোন ত্রুটি ছিলো না। এমনকি জামাণতের বিডি ফেরত দেওয়া হয়নি। বাতিলও হয়নি। কিন্তু প্রথম দফায় সরকারি মূল্য থেকে ৮ কোটি ৮০ রাখ টাকা রাজস্ব বেশী পেলেও সাধারণ কাগজপত্রে যে ঘাটতি ছিল, তা সংশোধনের সুযোগ না দেওয়া এবং এ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর দায় এবং দ্বিতীয় দফায় একেবারে দর কমে যাওয়ায় যা প্রশাসনের ব্যর্থতা হিসাবে জনগনের প্রশ্ন উঠলেও এ বিষয়ে তিনি কোন সদোত্তর দিতে পারেননি। এছাড়া অনন্যা ঠিকাদারদের দরপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়ার যে অভিযোগ এবং সিন্ডিকেটের প্রভাবের যে অভিযোগ উঠেছে।

সে বিষয়ে তিনি জানান, দরপত্রে জমা দিতে ঠিকাদারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব বা বাধা দেওয়ার বিষয়টি তিনি জানেনা। তবে তিনি বলেন, কেই লিখিত অভিযোগ দিলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিবেন। এছাড়া এ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা জড়িত থাকার যে অভিযোগ উঠেছে। তা প্রমাণিত হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম. বজলুর রশীদ জানান, রানীনগর বালুমহলের বিষয়ে আমার কাছে এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। আর্থিক লেনদেন বা অন্য কোনো অনিয়ম নিয়ে কারো অভিযোগ থাকলে আমার কাছে কিংবা দুদকে জানাতে পারেন। আমি লিখিত অভিযোগ পেলে দ্রুত তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিব। সামনে ৯ এপ্রিল আবারো বালুমহাল দরপত্র গ্রহণের আগেই শুরু হয়েছে সেই সিন্ডিকেটের তৎপরতা। ঐ প্রভাবশালী মহল যাতে জেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে সরকারের রাজস্ব আয়ে ক্ষতি করে ঐ প্রভাবশালী মহল নামমাত্র মূল্যে বালুমহাল ইজারা নিতে পারে।