রাজশাহী বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব: ২৬ হটস্পট চিহ্নিত, ঝুঁকিতে প্রাপ্তবয়স্করাও
স্টাফ রিপোর্টার: দেশের উত্তরবঙ্গের রাজশাহী বিভাগে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই বিভাগের ২৬টি এলাকাকে হামের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এবারের প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে উদ্বেগের দিক হলো, কেবল শিশুরাই নয়, বরং প্রাপ্তবয়স্করাও এই ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, মাঠ পর্যায়ে বেশ কিছু নমুনা পরীক্ষার পর বয়স্কদের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সাধারণত হামকে শিশুদের রোগ হিসেবে গণ্য করা হলেও, বড়দের আক্রান্ত হওয়ার এই প্রবণতা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক বায়ুবাহিত রোগ। বয়স্কদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি। বড়দের ক্ষেত্রে হামের জটিলতা শিশুদের তুলনায় অনেক সময় বেশি মারাত্মক হতে পারে।
রামেকের মিডিয়া মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাস জানান, গত শনিবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত (গত ২৪ ঘণ্টায়) রামেক হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে দুই শিশু। হাম সাসপেক্টেড হয়ে ভর্তি হয়েছে ২৪ জন। হাম থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৬ জন রোগী। নতুন ও পুরোনো সব মিলিয়ে বর্তমানে রামেক হাসপাতালে হাম সাসপেক্টেড শিশু ভর্তির সংখ্যা ১২৫ জন।
তিনি বলেন, পূর্বের চেয়ে গতকাল রোববার রামেক হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা বেশি। রোগীর চাপ বাড়তে থাকলে পুরো একটি শিশু ওয়ার্ডকে হাম আইসোলেশন ইউনিটে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য সচিবের নির্দেশনায় রাজশাহীর হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে আইসিইউতে থাকা হাম আক্রান্ত শিশুদের স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আইসিইউতে ১২ বেডের জায়গায় আরও ৬টি বেড যুক্ত করা হয়েছে। এখন শিশু আইসিইউয়ের বেড সংখ্যা মোট ১৮, যার মধ্যে ১২টি হাম আক্রান্ত শিশু রোগীদের জন্য এবং বাকি ৬টি হাম ব্যতীত অন্যান্য শিশু রোগীর (ঘড়হ-সবধংষবং) জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দুই সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি অনেকটাই খারাপ ছিল। তবে সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিবিড় চিকিৎসা কার্যক্রমের পর পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। সংক্রমণের হার কমে আসছে। শনিবার আট জেলার সিভিল সার্জনসহ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জরুরি সভা হয়েছে। হাম নিয়ন্ত্রণে নিবিড় চিকিৎসা সেবা জোরদারসহ টিকাদান কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া বিভাগের কোন এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব বেশি সেগুলিকে চিহ্নিত করে ওইসব এলাকায় স্বাস্থ্য কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ সেলের তথ্যমতে, বর্তমানে বিভাগের আট জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ২২৯ জনকে হাম সংক্রমণ ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে নমুনা পরীক্ষায় বিভাগে এ পর্যন্ত ১৪৩ জনের হাম আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে ৫৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন পক্ষে দাবি করা হলেও সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ১৭ জন। অন্যদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৮ শিশুর।
ভুক্তভোগী একাধিক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিভাগ হামের প্রাদুর্ভাব, সংক্রমণ ও শিশু মৃত্যুর তথ্য আড়াল করছে। একেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য একেক রকম এবং সংখ্যায় বড় গরমিল দেখা যাচ্ছে। সূত্রমতে, রাজশাহী বিভাগের ২৬টি এলাকাকে হাম সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের বয়স ৬ মাসের নিচে হলেও এবার বয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন এমন প্রমাণ মিলেছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার পর্যন্ত করা নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গতকাল রোববার থেকে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে রাজশাহী বিভাগের উপদ্রুত এলাকাগুলিতে। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক দপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. রোজী আরা খাতুন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ৫২০ জন শিশুর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ১৪৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে উপসর্গ নিয়ে বিভাগজুড়ে ২২৯ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, যেসব এলাকায় একাধিক রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেগুলোকে উপদ্রুত বা প্রাদুর্ভাব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত বিভাগের ২৬টি এলাকাকে হামের হটস্পট হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পাবনায় সর্বোচ্চ ১০টি, মহানগরীর ৫টিসহ রাজশাহীতে ৬টি, নওগাঁয় ৫টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩টি এবং নাটোর ও সিরাজগঞ্জে একটি করে উপদ্রুত এলাকা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তবে নিবিড় চিকিৎসা কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় হাম সংক্রমণের হার দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে আরও বলেন, যেসব এলাকায় একাধিক হাম আক্রান্ত শিশু পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোকে আউটব্রেক বা প্রাদুর্ভাব অথবা উপদ্রুত এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। রোববার থেকে এলাকাগুলিতে টিকাদানে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এদিকে হামে শুধু শিশুরাই আক্রান্ত হচ্ছে এমনটা নয়। নমুনা পরীক্ষা ও উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেলে চারজন বয়স্ক ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে ৫০ বছরের কাইমুদ্দিন, ৩৫ বছরের বদরুল ইসলাম ১৬ বছরের শাহাদী ইসলাম ও অজ্ঞাত একজন বয়স্ক রোগী রয়েছেন। রামেক হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, এই চারজনের শরীরে হামের উপসর্গ রয়েছে। চারজনের মধ্যে দুইজনের হাম সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসকরা আরও জানান, জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি, কাশি, বমি ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে এই চার বয়স্ক রোগী হাসপাতালে আসেন। কারো কারো ক্ষেত্রে নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতাও দেখা দিচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, এটা নতুন কিছু নয়। বয়স্করাও হামে আক্রান্ত হতে পারেন। অতীতে এমন ঘটনার নজির আছে। তবে চিকিৎসায় তারা সুস্থ হয়ে যান। তিনি আরও জানান, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা গেলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টিকা হামের টিকা কার্যক্রম শুরুর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
রাজশাহী মেডিকেল হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কুমার বিশ্বাস গণমাধ্যমকে জানান, ইতিমধ্যে ৪০ শয্যার একটি হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এছাড়া শিশু ও মেডিসিন বিভাগের প্রতিটি ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে একটি শিশু ওয়ার্ড সম্পূর্ণভাবে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড করার প্রস্তুতি চলছে। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত অক্সিজেন লাইন স্থাপন করা হচ্ছে। পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে বেড সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











