ঢাকা | মার্চ ৩১, ২০২৬ - ৩:৩৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

তানোরে জ্বালানি সঙ্কটে পাত্র নিয়ে পাম্পে দিনভর অপেক্ষা

  • আপডেট: Tuesday, March 31, 2026 - 12:00 am

সাইদ সাজু, তানোর থেকে: রাজশাহীর তানোরে জ্বালানি তেলের জন্য পাত্র হতে পাম্পে অপেক্ষার দীর্ঘ লাইন কৃষকদের। ৪ ঘণ্টা থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন শত-শত কৃষক। তেল দেয়ার খবরে পাম্পের সামনে আগে থেকেই (ভোর) থেকে পাত্র হাতে যারা অপেক্ষা করছেন তারাও চাহিদা মত তেল পাচ্ছেন না। ৩শ’ টাকা থেকে ৫শ’ টাকার তেল নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে কৃষকদের। চাহিদামত তেল না পাওয়া কৃষকরা হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার সময় এসব কৃষকদের চেহারায় ফুটে উঠছে হতাশার ছাপ।

তানোর উপজেলা কৃষি প্রধান এলাকায় পুরো দমে চলছে আলু উত্তোলন স্টোরজাত করণ ও বোরো চাষ ও ধান রোপণ। এসব কৃষি কাজে ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রের তেল পেতে কৃষকরা ছুটছেন এই পাম্প থেকে ওই পাম্প। যখন যে পাম্পে তেল দেয়ার খবর পাচ্ছেন সেই পাম্পে ছুটছেন কৃষকসহ মোটরসাইকেলসহ চালকরা। তেল দেয়া শুরুর আগেই ভোর থেকে পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল ও ভুটভুটিসহ তেলের পাত্র হাতে কৃষকদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ছে। তেল পেতে বাক বিতন্ডার পাশাপাশি হুড়াহুড়ি ও ঠেলাঠেলিসহ ঘটছে ছোট খাট মারামারির ঘটনাও।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে তেল সঙ্কটের আশঙ্কায় সারা দেশের মত তানোরের কৃষকসহ জ্বালানি তেলের ব্যবহার কারীরা তেল সংগ্রহ করে অনেকেই মজুদ করতে শুরু করেন। ফলে, পাম্প গুলো গ্রাহকদের চাহিদামত জ্বালানি তেল সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছেন। যে পাম্প গুলো এক গাড়ি তেল বিক্রি করতেন ১০ দিন থেকে ১৫ দিনে সেই পাম্প গুলোতে তেল আসার দিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে তেল। তেলের সরবরাহের তুলনায় চাহিদা মেটাতে পাম্প গুলো ২শ’ টাকা থেকে ৩শ’ বা ৫শ’ টাকা পর্যন্ত তেল দিচ্ছেন। গত রোববার দুপুরে তানোরের মুন্ডুমালা পৌর এলাকা মেসার্স বিশ্বাস ফিলিং স্টেশনে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলে ৩শ’ টাকার করে পেট্রল দেয়া হলেও অকটেন নেই। অপর দিকে ভুটভুটি ও ট্রলির দীর্ঘ লাইনের পাশাপাশি পাওয়ার ট্রিরাল ও কৃষি যন্ত্রের পাত্রেরও দীর্ঘ লাইনে রেখেছেন কৃষকরা। ডিজেল দেয়া হচ্ছে ৫শ’ টাকার করে। এভাবে চলতে থাকা অবস্থায় বিকাল ৩টার সময় তেল শেষ হয়েও গেলেও লাইনে তেল নিতে অপেক্ষায় রয়েছে শতাধিক মোটরসাইকেল ও ভুটভুটি এবং পাত্র হাতে অর্ধশত কৃষক।

তানোর উপজেলার কলমা ইউপির বিল্লি গ্রাম থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের মুন্ডুমালায় বিশ্বাস ফিলিং স্টেশনে তেলের জারকিন হাতে এসেছেন আব্দুস সামাদ নামের এক কৃষক। বিকাল ৩ টার সময় কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, তেল দেয়ার খবর শুনে সকাল ৬টার সময় পাম্পে এসেছি এখন পর্যন্ত তেলে পাইনি। তিনি বলেন, তার আগেও শত শত কৃষক জারকিন হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আরো বলেন, জমিতে চাষের ট্রাক্টর ও ট্রলির জন্য তেল না পেলে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যাবে। তার সামনে অর্ধশতাধিক জারকিনের সারি দেখা গেছে। হঠাৎ তেল শেষ হওয়ার খবরে উত্তেজিত হয়ে পড়েন দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে তেলের জন্য অপেক্ষা করা শতাধিক মোটরসাইকেলের চালকরা। এসময় সেখানে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা রাতে আগে থেকেই মোতায়েনকৃত পুলিশ সদস্যদের ওপর চড়াও হতেও দেখা গেছে। এক পর্যায়ে তেলের ট্যাংকি পরীক্ষা করার পর ফিরে যান মোটরসাইকেলসহ চালকরা। এর কিছু পরেই শেষ হয়ে যায় ডিজেল। এসময় অর্ধশতাধিক কৃষক ফিরে যান তেল ছাড়াই খালি পাত্র হাতে। এসময় কৃষকদের চোখে মুখে ফুটে উঠে হতাশার ছাপ।

বাধাইড় ইউপির খাড়ি কল্যা থেকে এসেছেন বাবুল হোসেন তিনি বলেন, আলু উত্তোলনের পর স্টোরজাত করতে ট্রলির জন্য এবং বোরো রোপণে জমিতে চাষের জন্য ট্রাক্টরের তেল শেষ হয়ে গেছে। সকাল ৭টায় এসেছি সকাল ৮টা থেকে তেল দেয়া শুরু হয়েছে এখন বিকাল ৩টা। এখনো তেল পাননি, তেল নিতে না পারলে তার কৃষি কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ৫শ’ টাকার ডিলের পাওয়া জারকিন হাতে মুন্ডুমালার এলাকার কৃষক আব্দুল করিম বলেন ফজরের নামাজের আগে লাইনে জারকিন নিয়ে দাঁড়িয়েছি লাইনে প্রায় ৮ ঘণ্টা পর ৫ শ টাকার তেল পেলাম। মুন্ডুমালা বিশ্বাষ ফিলিং স্টেশনের মালিক খাইরুল ইসলাম বলেন, আমরা আগে গাড়ি ভর্তি তেল পেতাম এখন সাপ্তাহে একদিন বা দুইদিন তেল পাচ্ছি যার পরিমাণও আগের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ। সকাল ৮টা থেকে কৃষকদের ৫শ’ টাকার করে ডিজেল তেল দেয়া হচ্ছে যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। তিনি বলেন, তেল দেয়ার খবর রাত থেকেই শত শত কৃষক লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন তাদের কৃষি যন্ত্রের জন্য তেলের জন্য। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন শত শত কৃষক। কৃষকদের জন্য তেলের বরাদ্ধ বাড়ানোর আহবান জানিয়েছেন তিনি।

তানোর উপজেলা কৃষি অফিসার সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, কৃষকদের ভোগান্তি দূর করতে আমরা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে প্রতিনিয়তই যোগাযোগ রেখে তেলের বরাদ্ধ বাড়ানোর চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, এখন পুরোদমে কৃষকরা আলু উত্তোলন ও পরিবহনের পাশাপাশি বোরো রোপণের কাজ করছেন। এ কারণে তেলের জন্য কৃষকরা পাম্পে ভিড় করছেন। আশা করছি বরাদ্ধ বাড়ানো হবে। আরো ১০/১৫ দিন লাগবে আলু উত্তোলন পরিবহন ও বোরো রোপণের জন্য। তিনি আরো বলেন, তেল সঙ্কটে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে। তবে, কৃষকদের ভোগান্তিতে রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাঈমা খান বলেন, কৃষি প্রধান তানোর উপজেলার কৃষকদের কৃষি যন্ত্রের তেলের বরাদ্ধ বাড়ানোর জন্য ডিসি স্যারসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে প্রতিনিয়তই যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং ডিজেলের বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য চাহিদা দেয়া হচ্ছে। আশা করছি বরাদ্ধ বাড়ানো হবে। কৃষকদেরকে সঠিক ভাবে তেল সরবারাহের জন্য উপজেলার ৪টি পাম্পেরই মালিকদের নির্দেশনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।