রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় যে কারণে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব
সোনালী ডেস্ক: হঠাৎ করেই রাজশাহী অঞ্চলসহ দেশে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। চাহিদার অনুপাতে টিকা মজুত না থাকা, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ সংকট, জনবল ঘাটতি, কর্মসূচিতে নজরদারির অভাব, টিকাদান কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ এবং নিয়মিত ক্যাম্পেইন না হওয়া-এসব কারণে দেশে হঠাৎ করে ছোঁয়াচে রোগ হাম ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সিদের শরীরে হাম সংক্রমিত হওয়ায় অভিভাবক-স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ইতোমধ্যে দেশব্যাপী আতঙ্ক ছড়ানো বায়ুবাহিত এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিন মাসে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে বাংলাদেশ সফলতা দেখিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের মধ্যে (২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর) হাম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ এ কর্মসূচি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
এদিকে দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্রুত প্রতিরোধ ও চিকিৎসাব্যবস্থায় জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার হামসহ সব ধরনের টিকা ক্রয়ে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) থেকে এ টিকা সংগ্রহ করা হবে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে টিকা সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সোমবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ চালু, ভেন্টিলেটর সরবরাহ এবং বিশেষায়িত ওয়ার্ড প্রস্তুতের কাজ চলছে। একই সঙ্গে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হামের সংক্রমণ হঠাৎ বাড়লেও আমরা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিয়েছি। মহাখালীতে একটি শিশুর মৃত্যুর পর বন্ধ থাকা আইসিইউ ইউনিট মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যে চালু করা হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড, আইসোলেশন সুবিধা ও ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মানিকগঞ্জ ও রাজশাহীতে নতুন ভেন্টিলেটর পাঠানোসহ ২০টি ভেন্টিলেটর সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, গত এক দশকে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম থাকলেও ২০১৮ সালের পর বড় কোনো হামের টিকা ক্যাম্পেইন হয়নি। এরই মধ্যে টিকা কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফকে টিকা কেনার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলা করছি। কবে থেকে টিকা কার্যক্রম চালু হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিকা আসবে। আসার সঙ্গে সঙ্গে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করব। জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই-আমাদের সব চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আশা করছি এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে আমরা টিকা পেতে থাকব। টিকা আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম কেবল সাধারণ সর্দি-জ্বর নয়; এটি অত্যন্ত সংক্রামক একটি বায়ুবাহিত ভাইরাস। এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং কোভিড-১৯, এমনকি ইবোলা ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হামের ভাইরাস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশ অ্যান্টিবডি নষ্ট করতে পারে। এর ফলে শিশু পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া বা ফ্লুর মতো সাধারণ রোগেও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হতে পারে। হামজনিত নিউমোনিয়ায় ফুসফুসের সংক্রমণ জটিল হওয়ার পর প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহে ভেন্টিলেটর ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) সাপোর্ট না পেলে মৃত্যু হতে পারে।
হামের অন্য জটিলতার মধ্যে মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনকেফেলাইটিস), যা থেকে শ্রবণশক্তি হারানো বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা এবং চোখের প্রদাহ হতে পারে। গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত হলে গর্ভপাত বা কম ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি থাকে।
জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচ) পরিচালক ডা. মো. মোমিনুর রহমান বলেন, নানা কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। তবে এজন্য সবাই যে মারা যাচ্ছে, সেটি ঢালাওভাবে বলা যাবে না। হামের টিকাদান ঠিকমতো না হওয়ায় সংক্রমণ বাড়ছে। নিয়মিত টিকাদান ছাড়াও পাঁচ বছর অন্তর একটি ক্যাম্পেইন হয়। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন হয় ২০২০ সালে। ২০২৪ সালে হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এর বাইরে দুই থেকে তিন বছর ধরে টিকার সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া ঠিকমতো টিকা কেনাও হয়নি। তিনি বলেন, কখনো মাঠ পর্যায়ে সংকট দেখা গেছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে ড্রপ-আউটের কারণে অনেক শিশু প্রথম ডোজ টিকা পেলেও দ্বিতীয় ডোজ পায়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গত তিন মাসে তাদের ল্যাবে হামের ১ হাজার ৬৪১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৬৯৬ জনের হাম শনাক্ত হয়, যা ৪২.৪১%।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত শিশুর নয় মাস বয়স থেকে হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু এবার প্রথম দেখা গেল নয় মাস বয়স হওয়ার আগেই অনেক শিশু এ ভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছে। এর কারণ, সন্তান জন্মদানের পর অনেক মা বিশেষ করে কর্মজীবী মায়েরা নিয়মিত স্তন্যদান করতে পারেন না। বাচ্চাকে সম্পূরক বা বিকল্প খাদ্য ও আর্টিফিশিয়াল দুধ খাওয়ানো হয়। অনেক মা নিজেও প্রয়োজনীয় টিকা নেননি। ফলে মায়ের শরীরে ও বুকের দুধ থেকে যে পরিমাণে ইমিউনিটি (রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা) পাওয়ার কথা, সেটি শিশুর শরীরে তৈরি হয় না।
ইপিআই কর্মসূচির কর্মকর্তারা বলেন, টিকাদানের জন্য ৩৭ জেলায় মাঠপর্যায়ে ৪৫ শতাংশ কর্মী নেই। এই কর্মীরা নির্দিষ্ট কেন্দ্রে টিকা দেন। সারা দেশে টিকাকেন্দ্র আছে প্রায় দেড় লাখ। পোর্টার (টিকা বাহক) আছেন ১ হাজার ৩২৬ জন। এই পোর্টাররা ৯ মাস ধরে বেতন পান না। এছাড়া গত বছর সারা দেশের স্বাস্থ্য সহকারীরা তিন দফায় কর্মবিরতিতে যান। ওই সময়ে টিকা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কোনো কোনো এলাকায় টিকাও নেই। অভিভাবকদের গাফিলতিতেও ১০ থেকে ২০ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় আসছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে টিকা কেনা হতো সরকারের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে। টিকার সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির সহায়তায় অল্প সময়ে টিকা কেনা সম্ভব ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়।
হামের প্রাদুর্ভাব ও করণীয় নিয়ে সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জাতীয় টিকাসংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (নাইট্যাগ) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজকের আলোচনায় রুটিন টিকা প্রদানে ঘাটতির বিষয় তুলে ধরা হয়। এর কারণ হিসাবে বলা হয় অপারেশন প্ল্যান বন্ধ। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে রুটিন টিকার পাশাপাশি ক্যাম্পেইন করে টিকা দেওয়া হবে। জুনের মধ্যে ক্যাম্পেইন শুরু করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য শিশুদের রেজিস্ট্রেশন শুরু হবে। এছাড়া ক্যাম্পেইনে টিকা প্রদানের বয়স ৯ মাস থেকে এগিয়ে এনে ৬ মাস করা হয়েছে। বয়স বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়েছে।
একই দিন হাম নিয়ে মন্ত্রণালয়ে আরেকটি সভা হয়। সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক, সিডিসি, আইইডিসিআর, আইসিডিআরবি পরিচালক ও বিএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন। জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মোহাম্মাদ মইনুল আহসান সোমবার দুপুরে বলেন, হামে মৃত্যু নিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সভার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এভাবে মৃত্যুর বিষয়টি সত্য নয়। তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ক্যাম্পেইন শুরুর পাশাপাশি চিকিৎসাব্যবস্থা জোরদার করা হবে।











