আইসিইউ’র অপেক্ষায় শিশুদের মৃত্যু: রামেক পরিচালককে ‘ফাঁসির কাষ্ঠে’ চড়াতে চাইলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড এখন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের করিডোরে কান পাতলেই এখন শোনা যায় সন্তান হারানো বাবা-মায়ের আর্তনাদ। গত আড়াই মাসের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। যেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (আইসিইউ) অভাবে অকালেই ঝরে গেছে ৫৩টি নিষ্পাপ প্রাণ। এছাড়াও আইসিইউতে চিকিৎসা পেয়েও জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়নি আরও ৯ জন শিশুর। গত ১১ মার্চ থেকে ২২ মার্চ, মাত্র এই ১১ দিনেই প্রাণ হারিয়েছে ৩৩ জন শিশু। আইসিইউ শয্যার জন্য হাহাকার এবং প্রতিদিন শিশুদের এই প্রাণহানি সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
এদিকে, রামেক হাসপাতালের এই মর্মান্তিক ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কড়া সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, এই ধরনের অবহেলার দায়ে হাসপাতালের পরিচালককে ‘ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানো’ উচিত।
শনিবার রাজধানীর শাহবাগে শহিদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘চিকিৎসার নৈতিকতা’ বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ১১ দিনে ৩৩ জন শিশু মারা গেছে রাজশাহী মেডিকেলে। অথচ সেখানকার পরিচালক আমাদের জানাননি যে তার কাছে ভেন্টিলেটর নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আমি ফোন করার পর তিনি (পরিচালক) দাবি করেন, মিডিয়া একটু বাড়াবাড়ি করছে। কিন্তু প্রতিবেদন পাওয়ার পর দেখা গেল, মিডিয়া যা বলেছে তা-ই সত্য। তিনি আর বিষয়টি অস্বীকার করতে পারেননি। সরকারি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে ব্যক্তি উদ্যোগে ভেন্টিলেটর সংগ্রহের কথা জানিয়ে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকার থেকে দ্রুত কিনে দেয়া কঠিন ব্যাপার। আমি ব্যক্তিগত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে দু-একজন ওষুধ প্রস্তুতকারকের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের সহায়তায় আজ জরুরি ভিত্তিতে তিনটি ভেন্টিলেটর কিনে দেয়া হচ্ছে। এটা সরকারি টাকায় নয়, বেসরকারি উদ্যোগে হচ্ছে। আজ আরও দুটি ভেন্টিলেটর ম্যানেজ করার চেষ্টা করব।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত শিশুদের বেশির ভাগই ছিল নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী এসব রোগের জটিলতা বাড়লে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়; কিন্তু রামেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই। তবে স্থানীয়ভাবে সাধারণ আইসিইউর ১২টি বেড শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে। ফলে বেড খালি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি বেডে একাধিক রোগী, কোথাও মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা। অক্সিজেনের জন্য অপেক্ষা। এক বেডে ২/৩ জন করে শিশু রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রোগীর স্বজনদের ঠাসাঠাসি আর গাদাগাদি অবস্থা। নার্সদের ব্যস্ততা আর স্বজনদের উৎকণ্ঠা সব মিলিয়ে এক চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে ওয়ার্ডজুড়ে।
এদিকে আইসিইউ সেবা পেলে শিশুগুলো বেঁচেও যেতে পারত বলে মনে করেন রামেক আইসিইউর ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘১২ শয্যার শিশু আইসিইউতে কেউ মারা না গেলে সাধারণত খালি হয় না। কোনো শিশু মারা গেলে বেড ফাঁকা হয়। তখন অপেক্ষমান থাকা তালিকা ধরে ফোন করা হয়। তিনি নিশ্চিত করেন, আইসিইউ না পেয়ে গত আড়াই মাসে ৫৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ১১ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যেই আইসিইউতে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা ২৮ শিশু মারা গেছে। আর ভর্তির পর মারা গেছে আরও ৯ শিশু।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন অপেক্ষামান সিরিয়াল আপডেট আমি নিজেই করি। গত ১৯ মার্চ সকালে শিশু আইসিইউতে সিরিয়াল ৩৭ নম্বর পর্যন্ত এসেছে। সর্বশেষ সিরিয়ালের রোগীর ঠিকানা রাজবাড়ী জেলায়। অর্থাৎ সেই ঢাকা বিভাগের রোগীও এখানে চলে এসেছে আইসিইউতে একটি বিছানা পাওয়ার জন্য। সকালে রাউন্ডের পর একটি বাচ্চার বাবা একটি আইসিইউ বেডের জন্য এমন ভাবে কান্নাকাটি করছিল, খুব খারাপ লাগছিল, অসহায় বোধ করছিলাম। পাবনা থেকে এসেছেন। এভাবে ঢাকা শহরের কোনো বাচ্চার অভিভাবকদের কান্নাকাটি হলে দেশের দায়িত্বশীলদের মনে হয়তো একটু সহানুভূতি পেতো, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিশু আইসিইউ তৈরি হয়েও যেতে পারতো। রাজশাহীর মতো মফস্বল শহরের মানুষের সর্বোচ্চ চিকিৎসা না পাওয়ার হাহাকার কেউ শোনে না।’
চিকিৎসকরা বলছেন, নিউমোনিয়ার পাশাপাশি হাম মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অভিভাবকরা শিশুদের টিকার ডোজ সম্পন্ন করছেন না। এ কারণে হাম হচ্ছে বেশি। হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে উদ্বেগজনকও বলছেন তারা। রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের নিয়মিত টিকা কার্যক্রম চলমান। কিন্তু কী কারণে হাম বাড়ল তা বলা যাচ্ছে না। তবে সারাদেশে শিগগিরই টিকা ক্যাম্পেইন করা হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর উদ্যোগ নেবে।’ রামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম বলেন, রাজশাহী মেডিকেলে বর্তমানে ৪০ শয্যার যে আইসিইউ চলছে, সেটা সরকার অনুমোদিত নয়। সম্পূর্ণ হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলে এটি। এখানে সরকার একজনকেও নিয়োগ দেয়নি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় ২০০ শয্যার একটি শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ১০ শয্যার শিশুদের আইসিইউ আছে। ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলেও কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি হস্তান্তরই করেনি, জনবল কাঠামো অনুমোদন হয়নি। রামেক হাসপাতালের আইসিইউর ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, রাজশাহীতে শিশু হাসপাতাল বিল্ডিং, শিশু আইসিইউর অবকাঠামো সব তৈরি হয়ে আছে। শুধু দরকার সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সদিচ্ছা।
সোনালী/জগদীশ রবিদাস











