ঢাকা | মার্চ ২২, ২০২৬ - ১০:১৩ পূর্বাহ্ন

ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যুদ্ধ পরিস্থিতি

  • আপডেট: Sunday, March 22, 2026 - 2:00 am

সোনালী ডেস্ক: ইরান যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহ শেষ হয়েছে। যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন—পরিস্থিতি ক্রমশ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী, মিত্রদের কাছ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘স্বল্পমেয়াদি অভিযান’ হবে—প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা না করেই মধ্যপ্রাচ্যে আরও বিপুলসংখ্যক সৈন্য মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে। আগামীতে কী হতে পারে তা নিয়ে অস্থিরতা বাড়ছে।

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানানোয় ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোকে ‘কাপুরুষ’ বলে গালি দিচ্ছেন আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত ট্রাম্প। তার দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ীই সবকিছু এগোচ্ছে। গত শুক্রবার এক ঘোষণায় তিনি বলেন, ‘সামরিকভাবে জয় নিশ্চিত হয়েছে।’

তবে তার এই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বরং ইরান এখন আরও অনমনীয়; তারা পারস্য উপসাগরে তেল-গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছে এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বোকার মতো’ সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প এখন নিজেই শুরু করা এই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বা প্রচার—কোনোটিই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। যুদ্ধের কোনো সুস্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ না থাকায় তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও দলের ভবিষ্যৎ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যেখানে রিপাবলিকানরা হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে এই যুদ্ধ গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ট্রাম্প নিজের জন্য ‘ইরান যুদ্ধ’ নামের একটি খাঁচা তৈরি করেছেন। এখন তিনি সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। এটিই এখন তার চরম হতাশার কারণ।’

অবশ্য হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এমন অবস্থার কথা স্বীকার করতে নারাজ। তিনি বলেন, ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাকে ‘টার্গেটেড কিলিং’-এর মাধ্যমে নির্মূল করা হয়েছে। দেশটির নৌবাহিনীর বড় অংশ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারও প্রায় ধ্বংস করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তার মতে, ‘এটি নিঃসন্দেহে একটি অবিসংবাদিত সামরিক সাফল্য।’

ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

গত এক সপ্তাহে ট্রাম্পের কূটনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাগুলো প্রকট হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনী পাঠাতে ন্যাটোর সদস্য ও অন্যান্য বিদেশি সহযোগীদের অনীহা দেখে ট্রাম্প বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন।

আলোচনা সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা জানান, বিশ্বজুড়ে একা হয়ে পড়ার ভয়ে ট্রাম্পকে তার কিছু উপদেষ্টা পরামর্শ দিয়েছেন যেন তিনি দ্রুত যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটি পথ খুঁজে বের করেন এবং সামরিক অভিযানের সীমা নির্ধারণ করে দেন। তবে ট্রাম্প এই পরামর্শে কতটা কান দেবেন, তা এখনো অস্পষ্ট।

বিশ্লেষকদের মতে, মিত্রদের এই অনীহার পেছনে কেবল যুদ্ধের আশঙ্কাই নয়; বরং গত ১৪ মাসে ট্রাম্পের ক্রমাগত মিত্রবিদ্বেষী আচরণও দায়ী। এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গেও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ইরানের দক্ষিণ পারস গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে ট্রাম্প আগে থেকে কিছু জানতেন না বলে দাবি করলেও, ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি—হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই করা হয়েছে।

অপারেশন এপিক ফিউরি ও দোদুল্যমানতা

বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ট্রাম্প কোন পথে হাঁটবেন, তার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।

তিনি চাইলে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন—হয়ত ইরানের প্রধান তেল কেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’ দখল অথবা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক ধ্বংস করতে দেশটির উপকূলে সৈন্য নামাতে পারেন। তবে এতে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে, যা সাধারণ আমেরিকানরা মেনে নেবেন না।

অন্য বিকল্প হিসেবে, ট্রাম্প চাইলে তড়িঘড়ি করে বিজয় ঘোষণা করে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু এতে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা বিপদে পড়বে। তারা একটি আহত ও প্রতিশোধপরায়ণ ইরানের মুখোমুখি হবে। তারা যে কোনো সময় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা উপসাগরীয় নৌপথে আবারও বাধা সৃষ্টি করতে পারে। যদিও ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কথা অস্বীকার করে আসছে।

গত শুক্রবার রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত কয়েক হাজার মেরিন ও নাবিক মোতায়েন করছে, যদিও ইরানে সরাসরি সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

যুদ্ধটি ট্রাম্পের নিজস্ব ‘মাগা’ (মেইক আমেরিকা গ্রেইট এগেইন) আন্দোলনের ওপর তার নিয়ন্ত্রণকেও আলগা করে দিচ্ছে। তার অনেক প্রভাবশালী সমর্থকই এখন এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকলে এবং মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়লে ট্রাম্পের জনসমর্থন আরও কমতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডেভ উইলসন বলেন, অর্থনৈতিক প্রভাব যখন সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে, তখন তারা প্রশ্ন তুলবে—কেন আমার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে? কেন হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে আমার আগামী মাসের ছুটি বাতিলের উপক্রম হচ্ছে?’

ভুল হিসাব-নিকাশ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হোয়াইট হাউসের ভেতর এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, এই সংঘাতের পরিণতি সম্পর্কে আগে থেকে আরও ভালো প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। যদিও কিছু কর্মকর্তার দাবি, পরিকল্পনা যথাযথই ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইরানের পাল্টা আঘাতের ক্ষমতাকে খাটো করে দেখা। তেহরান তাদের অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন বাহিনী নিয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে আঘাত হানছে এবং বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ যে পথ দিয়ে যায়, সেই হরমুজ প্রণালি প্রায় অচল করে দিয়েছে।

আফগানিস্তান ও তুরস্কে দায়িত্ব পালন করা সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন বাস বলেন, ‘ইরান যুদ্ধের পরিকল্পনা যেভাবে করা হয়েছিল, পরিস্থিতি সেভাবে না এগোলে কী করা হবে—সেই বিকল্প ভাবনাগুলো তাদের ছিল না।’

যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর হতাশাও ট্রাম্পের মধ্যে তত বাড়ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি গণমাধ্যমের ওপর চড়াও হয়েছেন এবং যুদ্ধের খবর প্রচারকে ‘দেশদ্রোহিতা’ বলে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছেন।

ওবামা প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ‘ট্রাম্প এখন খেই হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি কেন দেশকে এই যুদ্ধে জড়ালেন, এবং এর শেষ কোথায়—তা তিনি পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করতে পারছেন না।’